করোনাভাইরাস: বিনা বেতনে কাজ করছেন নন-রেসিডেন্সি কোর্সের চিকিৎসকরা

নিউজ নিউজ

ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:০৭ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৪, ২০২০

করোনাভাইরাস উপদ্রুত এই সময়ে সেলফ কোয়ারেন্টাইনে যাচ্ছে অফিস আদালতে কর্মরত অনেকে। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী বন্ধ হয়েছে স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়, কোচিং সেন্টারসহ সকল ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের নোটিস অনুযায়ী বন্ধ আছে মেডিকেল কলেজসহ সকল ধরনের চিকিৎসা শিক্ষা কার্যক্রম। জনসমাগম এড়ানোর জন্য হাসপাতালগুলোতে বুধবার (১৮ মার্চ) থেকে বন্ধ রয়েছে মর্নিং সেশনসহ পোস্ট গ্রাজুয়েশনের সকল ধরনের ক্লাস।

কিন্তু এই সময়েও ছুটি পাচ্ছে না চিকিৎসকরা। স্বাভাবিকভাবে করোনার বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ, তাতে তারা ফ্রন্টলাইনের যোদ্ধা। কিন্তু এই যোদ্ধাদের অনেকেই বিনা বেতনে, বিনা ভাতায় কাজ করছেন।

বড় সরকারি হাসপাতালগুলোতে সেবা দেওয়া চিকিৎসকদের সিংহভাগই সরকারিভাবে পদায়িত নন। অধিকাংশই বিভিন্ন পোস্ট গ্রাজুয়েশন কোর্সের ছাত্র। এর মধ্যে আবার নানা ভাগ আছে। এফসিপিএস ট্রেইনি, রেসিডেন্সি কোর্সের ট্রেইনি, নন-রেসিডেন্সি কোর্সের ট্রেইনি। এক সময় সকল বেসরকারি ট্রেইনিরাই কোনো ভাতা পেতেন না। অনেক আলোচনা, বাদ প্রতিবাদের পর এখন এখন এফসিপিএস এবং রেসিডেন্সি কোর্সের ট্রেইনিরা একটা নামমাত্র ভাতা পান। সেটার পরিমাণ মাসে ২০,০০০ টাকা মাত্র।

কিন্তু নন-রেসিডেন্সি কোর্সের ট্রেইনিরা এখনো কোনো ভাতা বা বেতন কিছুই পান না। করোনার সর্বোচ্চ ঝুকিতে থাকা কোনো পর্যায়ের কোনো চিকিৎসকই পান না কোনোরকম ঝুঁকি ভাতা। নন-রেসিডেন্সি কোর্সের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত পোস্ট-গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা কোর্স এবং নন-রেসিডেন্সি এমএস কোর্স। বিপুল সংখ্যক চিকিৎসক এই কোর্সের ছাত্র-ছাত্রী হাসপাতালগুলোতে নিয়মিত সেবা দিয়ে আসছেন। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে ২.৩০টার ডিউটির বাইরেও রোস্টার ভিত্তিতে মর্নিং-ইভিনিং ডিউটি পালন করতে হয় তাদের।

এই ডিউটি তাদের শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ, এ রকম একটা যুক্তি দেখিয়ে এই চিকিৎসকদের কোনো বেতন বা ভাতা দেয়া হয় না। অথচ সরকারি চিকিৎসক, রেসিডেন্সি কোর্সের চিকিৎসক, এফসিপিএস ট্রেইনি চিকিৎসক এবং নন-রেসিডেন্সি এমএস বা ডিপ্লোমা কোর্সের চিকিৎসকদের মধ্যে ডিউটি বা অন্যান্য দায়িত্বে কোনো হেরফের করা হয় না।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. খান মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘এমবিবিএস বাদে রেসিডেন্সি, এফসিপিএস, নন-রেসিডেন্সিদের কোনো ছুটি নাই। যেসব শিক্ষার্থীদের ক্লিনিক্যাল সাপোর্টের প্রয়োজন হয় না তাদের ছুটি দেওয়া হয়েছে। আর যাদের ক্লিনিক্যাল সাপোর্টের প্রয়োজন, তাদের ছুটি নেই। তারা ডিউটি করে।’

ন্যাশনাল ট্রমাটোলজি অ্যান্ড অর্থোপেডিক রিহ্যাবিলিটেশন ইনস্টিটিউটের (নিটোর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবদুল গনি মোল্লাহ বলেন, ‘এখন তো ক্লাস নেওয়া যাবে না, মর্নিং সেশন হবে না। সুতরাং নন-রেসিডেন্সিতে যারা আছেন, বেতনভুক্ত হোক কিংবা না হোক—সবার জন্য এটি প্রযোজ্য। এছাড়া অপারেশন, আউট ডোরে রোগী দেখা—এগুলো চলবে। ক্লাসগুলো বন্ধ হয়েছে। কিন্তু তারা ছুটি পাবেন না। নন-রেসিডেন্সি কোর্সটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এ ব্যাপারে তাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তারা যেহেতু কোর্সে আছে, তাদেরকে কাজ করে যেতে হবে। চিকিৎসক হিসেবে রোস্টার অনুযায়ী ডিউটি করতে হবে। তাদের ক্লাসটা শুধু বন্ধ থাকবে।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া  বলেন, বেসরকারি চিকিৎসকরা কোনো বেতন-ভাতা না পেলেও তারা তো প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন, ডিগ্রি পাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসরা তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। দিন শেষেও তারাও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হবেন। এটা তাদের একটি বড় প্রাপ্তি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা সব সেশন বন্ধ করে দিয়েছি। কিন্তু তাদের ছুটি দেওয়া হবে না। তাদেরকে কোনো ডিউটি দেওয়া হলে সেটা তারা করবে। এটা তাদের প্রশিক্ষণের অংশ। মেডিকেল শিক্ষার্থীরা তাদের থেকে আলাদা। ওদের সঙ্গে তুলনা করলে হবে না।’

অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া আরও বলেন, তারা যদি চলে যায়, তাহলে তাদের প্রশিক্ষণটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তখন তো তাদের ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। বিশেষ করে যারা বেসরকারি ক্যান্ডিডেট।

করোনা আতঙ্কে সারা দেশ এবং বিশ্ব। এই আতঙ্কের সময়েও এই চিকিৎসকরা দেশ এবং জনগণের স্বার্থে হাসপাতালে ডিউটি করছেন এবং সর্বোচ্চ পরিমাণ ঝুঁকির মধ্যে আছেন। কিন্তু পাচ্ছেন না কোনো ভাতা বা বেতন। এটা নিয়ে চরম হতাশায় নিমজ্জিত নন-রেসিডেন্সি কোর্সের এই চিকিৎসকরা।

এ অবস্থায় তাদের জন্য কোনো ভাতার ব্যবস্থা করা যায় কিনা জানতে চাইলে বিএসএমএমইউ উপাচার্য বলেন, ‘রেসিডেন্সিতে অনেক চেষ্টার পর ভাতা চালু হয়েছিল। পরবর্তীতে ওই তহবিল আরও বাড়িয়ে এখন সবার মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে। আমরা ডিপ্লোমা কোর্সের ক্ষেত্রেও উদ্যোগী হয়েছিলাম। কিন্তু তাদের ভাতার বিষয়টি সরকারের কাছ থেকে পাস করাতে পারিনি। রেসিডেন্সির মতো সেখানে আমরা সফল হতে পারিনি।’

করোনার ঝুঁকি শেষ হলে এ ব্যাপারে আবারও উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল রেসিডেন্সিতে ভাতার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হোক, এটা হয়েছে। এখন ডিপ্লোমার দিকে নজর দেওয়া যাবে।

জানতে চাইলে ন্যাশনাল ট্রমাটোলজি অ্যান্ড অর্থোপেডিক রিহ্যাবিলিটেশন ইনস্টিটিউটের (নিটোর) পরিচালক অধ্যাপক আবদুল গনি মোল্লাহ বলেন, বলেন, ‘রেসিডেন্সি ভাতা তো চালু হলো ২-৩ বছর আগে থেকে। এর আগে তো সবাই নন-রেসিডেন্সিই ছিল। …তো তাদের জন্য চালু করা যাবে না কেন?যদি সুযোগ থাকে তাহলে তাদের ভাতা দেওয়া উচিত।’

একই মত দিলেন ঢামেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক খান আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, ‘সবার জন্যই এটি প্রযোজ্য হতে পারে। একজন মানুষকে কাজ করাবো তাকে কিছু দেওয়া হবে না, এটা ঠিক না। এফসিপিএস-রেসিডেন্সি প্রোগ্রামের চিকিৎসকরা এ রকম টাকা পেতো না। সবই আস্তে আস্তে দেওয়া হয়েছে।’

নন-রেসিডেন্সি কোর্সের চিকিৎসকদের ক্ষোভ

এদিকে কোর্স আউটের অদৃশ্য ভয়ের কারণে ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন নিয়ে সামনে এসে প্রতিবাদও করতে পারছেন না কেউ। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ছে এটা নিয়ে। নন-রেসিডেন্সি কোর্সের চিকিৎসকদের নিজস্ব ফেসবুক গ্রুপগুলোতে এটা নিয়ে রয়েছে ক্ষোভ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নন-রেসিডেন্সি কোর্সের এক চিকিৎসক বলেন ‘আমরা হাসপাতালের কোনো কর্মকর্তা নই। আমার দায়িত্ব পালন আমার নিজস্ব শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে। এখন যেহেতু শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ এবং হাসপাতালে ডিউটির জন্য আমি আলাদা কোনো ভাতাও পাবো না, তাই আমাদেরও ছুটি পাওয়া উচিত’।

আরেকজন চিকিৎসক বলেন, ‘এই ঝুঁকির সময়েও আমরা কোনোরকম ঝুঁকি ভাতাতো দূরের কথা, জীবন ধারণের জন্যেও একটা টাকা পাই না। অথচ এই সময়ে হাসপাতালে ডিউটি করে নিজের জীবনের পাশাপাশি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছি’।

পেশাজীবী নেতারা যা বললেন

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশনের (বিডিএফ) প্রধান উদ্যোক্তা ডা. নিরুপম দাশ  বলেন, ‘যারা রেসিডেন্সির মতো পরীক্ষা দিয়ে কোর্সে ঢুকবে তাদের প্রত্যেকেরই ভাতার ব্যবস্থা করা হোক। এটা দুই বছরের কোর্স হোক, কিংবা পাঁচ বছরের কোর্স। ডিপ্লোমা কোর্সের চিকিৎসকদের ভাতা না দেওয়া হচ্ছে ওদের বা ওদের মেধার প্রতি চরম অবমূল্যায়ন।

ডিপ্লোমা কোর্সগুলোতে অধ্যয়নরতদের ভাতার ব্যাপারে জোর দাবি জানিয়ে ডা. নিরুপম দাশ বলেন, ‘তাদেরকেও রেসিডেন্সির সমপরিমাণ ভাতা দিতে হবে। কোর্সের সময় কম হওয়ায় যদি ভাতা দেওয়া না হয়, তাহলে এসব কোর্স বন্ধ করে দেওয়া হোক।’

জানতে চাইলে ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি এন্ড রাইটসের (এফডিএসআর) মহাসচিব ডা. শেখ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, পোস্ট-গ্রেজুয়েশনের সময় বলা হয়, ভাতা দেওয়া হলে তারা পড়াশোনায় মনোনিবেশ করবে, প্রাইভেট প্রাকটিস করবে না। এভাবে যদি তাদের জন্যও ভাতার ব্যবস্থা করা যায়, তবে ভালো হতো। রেসিডেন্সিদের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে একটা বাজেট থাকে, যা ইনস্টিটিউট থেকে বরাদ্দ দেয়া হয়। নন-রেসিডেন্সিদের ভাতা প্রদানের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো তহবিল নেই।

নন-রেসিডেন্সিদের জন্য ভাতা প্রদানের দাবি করে তিনি বলেন, পোস্ট-গ্রাজুয়েশনের সময় যেহেতু তারা প্রাকটিস বাদ দিয়ে পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকেন। সে হিসেবে তারা ভাতার দাবিদার।

ডা. শেখ মামুন আরও বলেন, চিকিৎসকদের সাধারণত একটি ঝুঁকি থাকেই, তবে কম বেশি। একেক ডিসিপ্লিনে ঝুঁকির ধরণ একেক রকম। যেসব রোগী দেখা হচ্ছে, বিষয়টি এর উপর নির্ভর করে। তবে তারা যেহেতু পোস্ট গ্রাজুয়েট স্টুডেন্ট, সেহেতু রেসিডেন্সির মতো করে অবশ্যই ভাতা দিতে হবে। তাহলে পড়াশোনার সময়টা ঠিক মতো পার করতে পারবে। ভাতা পেলে তারা আরও নিবেদিত হয়ে সেবা দিতে পারবে। এতে তাদের শিক্ষাটাও ভালো হবে। ওভার প্রাকটিস করার বা রোগী দেখতে যাওয়ার চিন্তা থাকবে না।

আপনার মতামত দিন :