১০ পাতা করে নাপা কিনেছেন একেকজন, বরিশালে ওষুধ সংকট

নিউজ নিউজ

ডেস্ক

প্রকাশিত: ৮:০০ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৬, ২০২০

বরিশালের ফার্মেসিগুলো থেকে প্যারাসিটামল, অ্যান্টি-হিস্টামিন, অ্যান্টি-ম্যালেরিয়ার, ভিটামিন সি, অ্যাজিথ্রোমাইসিন জাতীয় ওষুধ গায়েব করে দেয়া হয়েছে। ফলে ফার্মেসিগুলোতে এই জাতীয় নানা ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে ফার্মেসি থেকে মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস ও স্যানিটাইজার উধাও হয়ে গেছে।

বরিশাল নগরীর বিভিন্ন এলাকার সাতজন ফার্মেসি মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিশ্বজুড়ে মহামারি আকারে ছড়ানো করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে গত রোববার ১০ দিনের ছুটি ঘোষণা করে সরকার। বৃহস্পতিবার থেকে ১০ দিনের ছুটি শুরু হয়। এই ১০ দিন বাড়িতে অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। প্রশাসনকে সহায়তা দিতে সশস্ত্র বাহিনী নামানো হয়েছে এমন খবরে রোববার থেকে ফার্মেসিগুলোতে ওষুধ কিনতে ক্রেতাদের ভিড় বেড়ে যায়। সেই সঙ্গে প্যারাসিটামল, অ্যান্টি-হিস্টামিন, অ্যান্টি-ম্যালেরিয়ার, ভিটামিন সি, অ্যাজিথ্রোমাইসিন জাতীয় ওষুধের বিক্রি বেড়ে যায়।

ফার্মেসি মালিকরা জানিয়েছেন, গত চারদিনে প্যারাসিটামল, অ্যান্টি-হিস্টামিন, অ্যান্টি-ম্যালেরিয়ার, ভিটামিন সি, অ্যাজিথ্রোমাইসিন জাতীয় ওষুধ যে পরিমাণ বিক্রি হয়েছে, গত চার মাসেও তা হয়নি। চাহিদা মতো সরবরাহ না থাকায় ওসব ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে।

এদিকে নগরীর অধিকাংশ ফার্মেসিতে মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার নেই। হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেছে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ব্যবহৃত এসব পণ্যসামগ্রী।

ফার্মেসি মালিকরা জানিয়েছেন, দেশে করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্তের পর হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বিক্রি বেড়ে যায়। তবে শুধু এ কারণে সংকট তৈরি হয়েছে বলা যাবে না। প্রশাসনের কর্মকর্তারা দোকান থেকে গাড়িভর্তি করে হ্যান্ড স্যানিটাইজার কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এরপরও তাদের চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। আরও হ্যান্ড স্যানিটাইজার চাচ্ছেন তারা।

নগরীর রূপাতলী হাউজিং এলাকার বাসিন্দা নাসির উদ্দিন সোহাগ। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। সোহাগ জানান, তার পরিবারে সদস্য সংখ্যা পাঁচজন। সোমবার তিনি এলাকার একটি ফার্মেসি থেকে জ্বরের জন্য ১০ পাতা নাপা, সর্দির জন্য ১০ পাতা এলাট্রল ও কাশির জন্য তিন বোতল সিরাপ কিনেছি।

নগরীর বটতলা বাজারসংলগ্ন নাফি ফার্মেসির মালিক মীর হাসান মোর্শেদ জানান, তার ফার্মেসিতে ৩৫০-৪০০ ধরনের ওষুধ রয়েছে। তবে গত চারদিনে প্যারাসিটামল, অ্যান্টি-হিস্টামিন, অ্যান্টি-ম্যালেরিয়ার, ভিটামিন সি, অ্যাজিথ্রোমাইসিন জাতীয় ওষুধ যে পরিমাণ বিক্রি হয়েছে, গত চার মাসেও তা হয়নি। একেকজন ১০ পাতা নাপা কিনেছেন। অতিরিক্ত চাহিদার কারণে ওষুধের সংকট চলছে।

মীর হাসান মোর্শেদ জানান, তিনি খুচরা বিক্রেতা। পাইকারি দোকান থেকে কিনে এনে তিনি ওষুধ বিক্রি করেন। ওসব ওষুধের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় তাকে আগের চেয়ে বেশি দামে ওষুধ কিনতে হয়। পাঁচদিন আগে নাপা ৫১০ পিস ট্যাবলেটের বক্স কিনেছেন ৩৫৮ টাকায়। বর্তমানে ওই বক্স কিনতে হচ্ছে ৩৭৫ টাকায়।

নগরীর কাকলীর মোড় সিটি ফার্মেসির মালিক সুশান্ত কুমার বিশ্বাস বলেন, ওষুধ কোম্পানিগুলো চাহিদামতো ওষুধ সরবরাহ করতে পারছে না। এ কারণে প্যারাসিটামল, অ্যান্টি-হিস্টামিন, অ্যান্টি-ম্যালেরিয়ার, ভিটামিন সি, অ্যাজিথ্রোমাইসিন জাতীয় ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে।

নগরীর পাইকারি ও খুচরা ওষুধ বিক্রির অন্যতম প্রতিষ্ঠান জেলখানা মোড় এলাকার বিষ্ণুপ্রিয়া ফার্মেসির মালিক হরিমোহন কর্মকার বলেন, প্যারাসিটামল, অ্যান্টি-হিস্টামিন, অ্যান্টি-ম্যালেরিয়ার, ভিটামিন সি, অ্যাজিথ্রোমাইসিন জাতীয় ওষুধ গত চারদিনে যা বিক্রি হয়েছে, গত চার মাসেও তা বিক্রি হয়নি। অনেকেই অতিরিক্ত ওষুধ কিনে বাড়িতে মজুত রাখছেন। প্রয়োজনে যেন তাকে ফার্মেসিতে আসতে না হয়।

বিষ্ণুপ্রিয়া ফার্মেসির মালিক হরিমোহন কর্মকার বলেন, বিক্রয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ওষুধ কোম্পানিগুলোতে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। তারা জানিয়েছেন ওষুধ তৈরির কাঁচামালের সংকট রয়েছে। এ কারণে তাদের সরবরাহ করতে সময় লাগবে। সরবরাহ না হলে আগামী ১৫ দিন পর এসব ওষুধ আর বাজারে পাওয়া যাবে না।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. মনোয়ার হোসেন বলেন, আবহাওয়ার পরিবর্তন হলে জ্বর-সর্দি-কাশি বা সামান্য গলাব্যথা হতে পারে। এসব মানেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত, এটা ঠিক নয়। তবে একবার ঠান্ডা লাগলে তা সারতে অন্তত এক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। কাশি তো আরও বেশ কয়েকদিন থাকতে পারে। ভয়ের কিছু নেই। ভাইরাস জ্বরের পর জ্বর-সর্দি ভালো হয়ে গেলেও সাধারণত কাশি ভালো হতে চায় না। কয়েক সপ্তাহব্যাপী লেগেই থাকে। হাঁপানি, অ্যালার্জি বা সাইনোসাইটিস না থাকলেও এমনটি হতে পারে। এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। অনেক সময় এমনিতেই সেরে যায়।

ডা. মনোয়ার হোসেন আরও বলেন, আমাদের অতিরিক্ত ওষুধ সেবনের প্রবণতা আছে। এমন মা-বাবাও আছেন, যারা শিশুসন্তানের সর্দি জ্বরে অস্থির হন। এমন লোকের সংখ্যাও কম নয়, যারা চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে ওষুধের দোকানির কাছে অ্যান্টিবায়োটিক চান, ব্যথার ওষুধ চান। যদিও চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ও পেইন কিলার কেনাবেচা করা নিষিদ্ধ। কিন্তু এই নিষেধ রোগীরা মানেন না, ওষুধের দোকানিও মানেন না। ওষুধের যৌক্তিক ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।

ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের বরিশাল কার্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক অদিতি স্বর্ণা বলেন, প্যারাসিটামল, অ্যান্টি-হিস্টামিন, অ্যান্টি-ম্যালেরিয়ার, ভিটামিন সি, অ্যাজিথ্রোমাইসিন জাতীয় ওষুধ সংকটের কথা তার জানা নেই। তবে অ্যান্টি-ম্যালেরিয়ার ওষুধের সংকট থাকতে পারে। এ কারণে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর থেকে সংশ্লিষ্ট কোম্পনিগুলোকে অ্যান্টি-ম্যালেরিয়ার ওষুধ উৎপাদনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

আপনার মতামত দিন :