করোনাভাইরাস মোকাবেলা: খাবার ও পরিবহন সংকটে চিকিৎসকরা

নিউজ নিউজ

ডেস্ক

প্রকাশিত: ৬:২৬ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৭, ২০২০

করোনাভাইরাস মহামারীতে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় কর্মক্ষেত্রে উপস্থিত হতে গিয়ে নানা ভোগান্তিতে পড়ছেন দেশের চিকিৎসকরা। এদিকে সারা দেশে অঘোষিত লকডাউনের কারণে খাবার হোটেলগুলো বন্ধ রয়েছে। এতে চিকিৎসকরা খাবারেরও সংকটে পড়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্তত ১০জন চিকিৎসক ফোনে জানিয়েছেন, সারা দেশ লকডাউন হলেও হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের কোন ছুটি নাই। প্রতিদিনই চিকিৎসকরা রোস্টার করে ডিউটি পালন করছে। এই মুহূর্তে পরিবহন সংকটের কারণে হাসপাতালে আসা যাওয়া করতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এমনকি আশেপাশের খাবার হোটেলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খাদ্য সংকটেও পড়তে হচ্ছে।

এছাড়াও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ডিউটি শেষে বাসায় ফেরার পথে চিকিৎসকদেরকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ভোগান্তিতেও পড়তে হচ্ছে বলে জানা গেছে। গত ২৫ মার্চ দুপুরে হাসপাতালের ডিউটি শেষে বাসায় ফেরার পথে রাজবাড়ি জেলার পাংশা উপজেলায় ডা. সুপ্রভ আহমদ নামের এক চিকিৎসককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আহ্সান উল্লাহর বিরুদ্ধে। ডাক্তার পরিচয় দেয়ার পরেও ওসি তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। এ ঘটনায় চিকিৎসকদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

এ বিষয়ে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি এম ইকবাল আর্সলান বলেন, চিকিৎসকদের অধিকার ও পেশাগত নিরাপত্তার ব্যাপারে আমরা সচেতন। কিন্ত উদ্ভুত পরিস্থিতিতে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বেশ কিছু নির্দেশনা দ্বারা চিকিৎসকরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন বলে আমরা অবগত হয়েছি এবং আমাদের গোচরীভূত হওয়া মাত্র প্রত্যাহার ও পরবর্তীতে বাতিলের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।

তিনি বলেন, চলাচলকারী চিকিৎসাকর্মীরা যাতে আইন শৃঙ্খলা-বাহিনী দ্বারা হয়রানির শিকার না হন সেজন্য মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়কে অনুরোধ করেছি, তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। আপনাদের যাতায়াতের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে বলা হয়েছে। করোনা ভাইরাসের জন্য নির্ধারিত হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীদের স্থানীয়ভাবে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলেছি।

পরিবহন সংকট প্রসঙ্গে শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, আমার হাসপাতালে যেসব চিকিৎসক রোস্টারের মাধ্যমে ডিউটি করছেন, তাদেরকে আমি বলে দিয়েছি ডিউটি শেষে পরিচালকের রুমে এসে জড়ো হতে। পরে এখান থেকে সবাইকে হাসপাতালের উদ্যোগেই বাসায় পৌঁছে দেয়া হবে। আর যারা আশপাশে থাকেন, তাদের যাওয়া আসার সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবুও যাদের সমস্যা হয়, তারা যদি পরিচালকের অফিসে এসে যোগাযোগ করেন, তাহলে অবশ্যই এটা আমরা দেখবো। আর যারা দূরে থাকেন, তাদের জন্য আমার হাসপাতালের ট্রান্সপোর্ট রেডি আছে। ডিউটি শেষে তারা একসাথে আসলে তাদের বাসায় পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব আমাদের।

দেশের ক্রান্তিলগ্নে ডিউটি শেষে যাওয়ার পথে চিকিৎসক লাঞ্ছিতের বিষয়ে বিএসএমএমইউ উপাচার্য বলেন, এ মুহূর্তে চিকিৎসকরা জীবনবাজি রেখে চিকিৎসা দিচ্ছে, এর মধ্যে কোন কোন জায়গায় চিকিৎসককে লাঞ্ছনার ব্যাপারটি আমাদের জন্য খুবই দুর্ভাগ্যজনক। এ মুহূর্তে একজন সেবা দানকারী সে যদি তার পরিচয় দেয়, তাহলে তো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী উচিত তাকে আরো সহায়তা করা। জাতির ক্রান্তিলগ্নে যদি তারা সার্ভিস দিতে গিয়ে সহায়তার বিপরীতে লাঞ্ছিত হয়, তাহলে তারা সার্ভিস দিবে কিভাবে? জীবনেের ঝুঁকি নিয়ে যারা এমুহূর্তে কাজ করছে, কোথায় আমরা তাদেরকে উৎসাহিত করবো, তা না করে উল্টো যদি তাদের বাধাগ্রস্ত করা হয় তাহলে তো ব্যাপারটা খুবই খারাপ হয়ে যায়। সকলেই তো জীবনের মায়া আছে। এই সময়টা তো একটা যুদ্ধের মতো, যেকোন সময়েই তার প্রাণ হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। ডেঙ্গুর চেয়ে তো এই রোগটা মারাত্মক। সুতরাং এ মুহূর্তে এ ধরনের কাজ খুবই নিন্দনীয়। কোন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী যদি এমনটা করে থাকে, তাহলে তারা অন্যায় করেছে। আমি সবাইকে অনুরোধ করবো, এই সময়ে ডাক্তারদেরকে সহায়তা করার জন্য।

তিনি বলেন, এ পর্যন্ত আমার হসপিটালে কেউ লাঞ্ছিত হয়েছে বলে আমার কাছে কোন অভিযোগ আসেনি। তবে আমাদের একজন সহকারি অধ্যাপককে শুনেছি যে, ক্যান্টনমেন্টের ভেতর দিয়ে তাকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। পরে আমাদের ব্রিগেডিয়ার সাহেব (বিএসএমএমইউ পরিচালক) কথা বলে ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ খান বলেন, আমাদের ডাক্তারদের যাতায়াতের ব্যাপারে পুলিশ প্রশাসনকে বলে দিয়েছি। কোন ধরনের সমস্যা হওয়ার কথা না। আমাদের হাসপাতালে যেসকল ডাক্তাররা আছেন, তাদেরকে প্রিন্সিপালের পাস দেওয়া আছে। যাদের গাড়ি আছে তারা পাস নিয়ে চলে আসবে। এছাড়া ইন্টার্ন চিকিৎসকরা ইন্টার্ন হোস্টেলে আমার ক্যাম্পাসের মধ্যেই থাকে। আইএমও, সিএ, রেজিস্ট্রারদের জন্য সরকারি কোয়ার্টার আছে, তারা সেখানে থাকে। আর যারা দূরে থাকেন এবং অন্যান্য পরিবহনে আসেন, তাদের একটু আসতে কষ্ট হয়। তাদের ব্যাপারটা নিয়ে আজই পরিচালকের সাথে কথা বলবো। তাদের জন্য প্রয়োজনে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য যে বাস রয়েছে সেগুলো দিয়ে আনা নেওয়া করা যায় কিনা বা হাসপাতালের অ্যাম্বুল্যান্স দিয়ে তাদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করা যায় কিনা, এটা নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিবো।

ঢামেক অধ্যক্ষ বলেন, দেশে করোনার বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে সরাসরি নেতৃত্ব দিচ্ছে ডাক্তাররা। এই মুহূর্তে সবার উচিত হবে ডাক্তারদেরকে সহযোগিতা করা বা কাজের সুযোগ তৈরি করে দেয়া। তারপরও মাঝেমধ্যে আমাদের দেশে কোথায় যে কি হয়ে যায়, সেটা আমার বুঝে আসে না। বলা যায় যে, যেটা হওয়ার কথা নয়, সেটাই হয়ে যায়। সেটা আমাদের কারো জন্যই কাম্য নয়। সবাই জানে যে, চিকিৎসকরা এ মুহূর্তে কিভাবে কাজ করছে, তারা দেশের জন্য জীবনকে বাজি রাখছেন। সবার প্রতি আমার অনুরোধ, চিকিৎসকদের সহায়তা করুন।

তিনি বলেন, আমি সকল চিকিৎসকদেরকে বলছি যে, হাসপাতাল পরিচালক বা প্রিন্সিপালের পাসটা নিয়ে রাখবেন। এছাড়াও সাথে আপনার আইডেন্টিটি কার্ড রাখবেন এবং আপনি বলবেন আপনি কেন বের হয়েছেন। আশা করি কোন সমস্যা হবে না।

আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্দেশে ডা. আবুল কালাম আজাদ খান বলেন, আপনাদের যদি সুযোগ থাকে, আমার একজন ডাক্তার যদি কর্মস্থলে বা ডিউটি শেষ করে যেতে না পারে, তাহলে তাকে একটু সহযোগিতা করে সেখানে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে দিবেন। কারণ একজন ডাক্তার যদি হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন, তাহলে তিনি অনেক মানুষের জন্য কাজ করতে পারবেন।

এদিকে, সারাদেশ লকডাউন থাকায় সারাদেশেই দোকানপাট থেকে শুরু করে খাবার হোটেলগুলোও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলে ঢাকায় বসবাসরত নাগরিকরা বিপর্যয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে চিকিৎসকদের মধ্যে এক রকম খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, হাসপাতালের আশেপাশের হোটেলগুলো প্রশাসন বন্ধ করে দিয়েছে। সবমিলিয়ে মারাত্মক ধরনের একটা বিপর্যয়ে পড়তে হচ্ছে।

এ নিয়ে ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, যারা নিয়মিত ডিউটি করছেন, আমি শুনেছি হোটেলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের খাবারের সমস্যা হচ্ছে। এটা নিয়েও আমি সবাইকে বলে দিয়েছি যেন চিকিৎসক, নার্স, চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারিসহ সবাইকেই যেন খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। খাবারের ব্যবস্থা অবশ্যই করতে হবে, নয়তো তারা ডিউটি করবেন কিভাবে?

অন্যান্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উদ্দেশে বিএসএমএমইউ উপাচার্য বলেন, যেসকল হাসপাতালে ডাক্তাররা এ মুহূর্তে এভাবে সেবা দিচ্ছে, তাদেরকে সর্বোচ্চ সাপোর্ট দিতে হবে। এই সময়টা একটা যুদ্ধের মতো, নয়তো কে এভাবে কাজ করতে আসবে? প্রত্যেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে তাদের রোস্টার অনুযায়ী কর্মরত সকল চিকিৎসক, নার্সসহ সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে হবে।

অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ খান বলেন, আমাদের হাসপাতালের (ঢামেক) ক্যান্টিন চালু আছে, হোস্টেলগুলোতেও ক্যান্টিন চালু আছে। সেখানে তারা নিজেদের মতো করে রান্নার ব্যবস্থা করেছে। আশা করি সমস্যা হচ্ছে না। তবে যদি খাবার-দাবার নিয়ে এরকম সমস্যা হয়, তাহলে আমরা দেখবো।

তবে অন্যান্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে চিকিৎসকরা যুদ্ধে লিপ্ত আছে। তাদেরকে সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে তাদের পাশা থাকা সকল হাসপাতালের কর্তব্য। জেলা শহর বা উপজেলাগুলোর যে হাসপাতালে বেশি চাপ বেশি থাকে, সেখানে স্থানীয় প্রশাসন দুইয়েকটি ক্যান্টিনের স্পেশাল অনুমতি দিয়ে তাদেরকে রান্নার ব্যবস্থা করে দিতে পারে। এবং এই সময়ে এটা উচিত। প্রশাসন সাহায্য করলে যেকোন সমস্যাই সমাধান করা সম্ভব।

আপনার মতামত দিন :