করোনাভাইরাসে প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্য

নিউজ নিউজ

ডেস্ক

প্রকাশিত: ৬:৩০ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৭, ২০২০

আপনার বয়স যা-ই হোক, আপনার মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতা কিন্তু বহুবিধ বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। পারিপার্শ্বিক পরিবর্তনের দ্বারা প্রভাবিত হয়। করোনা ভাইরাস নিয়ে চলমান বৈশ্বিক সংকটে তাবৎ মানুষই শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে আছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকি ও আতংকে আছেন বয়োবৃদ্ধরা। প্রাত্যহিক কার্যক্রমের রুটিন পরিবর্তন হওয়া ও সহযোগিতার মাধ্যমগুলো সংকুচিত হওয়ায় তারা নিদারুণ কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। বিপন্ন বোধ করছেন। নিজস্ব ইগো বোধের কারণে অনেক সময় তারা পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খেয়ে চলতে পারেন না। অনেক সময় জরুরি বিষয়কে অস্বীকার করে বসেন কিংবা উপেক্ষা করেন। তাই এমতাবস্থায় করোনা ভাইরাসজনিত মহামারী মোকাবেলায় তাদের সম্পূর্ণ সঙ্গ নিরোধ রাখা যেমন অসম্ভব, আবার সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে তাদের মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখাও চ্যালেঞ্জিং।

বয়োবৃদ্ধদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতা মোটাদাগে কয়েকটি বিষয়ের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত।

১. বর্তমান ও পূর্বের মানসিক অবস্থা: তার বর্তমান ও পূর্বের মানসিক অবস্থা আমলে নিতে হবে। প্রবীনদের বিভিন্ন মানসিক রোগ অমূলক বা অপ্রতুল নয়।  পূর্বের রোগ বর্তমান আতংক ও চাপের কারণে বাড়তে পারে।  অথবা পূর্বের অনির্ণীত বা সুপ্ত মানসিক রোগ এখন প্রকাশ পেতে পারে।  এছাড়া চলমান স্ট্রেসের কারণে নতুন করে দুশ্চিন্তা, বিষণন্নতা তৈরি হতে পারে।

২. শারীরিক স্বাস্থ্য, ব্যথা ও বিকলাঙ্গতা: যাদের বিভিন্ন ক্রনিক ডিজিজ আছে এখন তা আরো বাড়তে পারে। দুশ্চিন্তা ও স্ট্রেসের কারণে ডায়াবেটিস, বাত ব্যথা কিংবা আলসারের ব্যথা, রক্তচাপ বাড়তে পারে। এসময় ঔষধের সংকট বা সেবনের কম-বেশির কারণে সমস্যা আরো ঘনীভূত হতে পারে। আবার রোগবৃদ্ধির কারণে দুশ্চিন্তা, বিষণন্নতা, অত্যধিক মৃত্যুর চিন্তা জেঁকে বসতে পারে।

৩. সামাজিক দূরত্ব ও সঙ্গনিরোধ করার কারণে যত্নের অভাব ও অবহেলার শিকার হতে পারেন। একাকী ও বিপন্ন বোধ করতে পারেন। দৈনিক চলা-ফেরা, খাওয়া-দাওয়া ও অন্যান্য কাজের রুটিন বিঘ্নিত হতে পারে। এক্ষেত্রে পরিবার, প্রতিবেশী, বিভিন্ন সামাজিক ও স্বাস্থসেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান শারীরিক সাক্ষাৎ বহির্ভূত অন্য সকল উপায়ে তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলা আশু দায়িত্ব।

৪. অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পদ ক্ষয়-ক্ষতির জন্য তারা মনমরা হয়ে যেতে পারেন। প্রিয়জনদের বিচ্ছেদ কিংবা মৃত্যু তাদের ভয়াবহ মানসিক অস্থিরতা, ইনসোমনিয়া ও শোকের মধ্যে ফেলে দিতে পারে। এই শোক দীর্ঘায়িত হলে তাও বিষণন্নতাসহ অন্যান্য মানসিক রোগকে আমন্ত্রণ জানাবে।

এমতাবস্থায় আমাদের সকলের দায়িত্ব আমাদের সিনিয়র সিটিজেন যারা তাদের যৌবনের মূল্যবান সময়, শ্রম ও প্রতিপত্তি আমাদের উত্তর প্রজন্মের জন্য ব্যয় করে এখন অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছেন, তাদের সহযোগিতা ও সাহায্যে এগিয়ে আসা।  কিছু করণীয় আলাপ করা যাক-
১. আপনার পরিবারের অথবা বন্ধু-বান্ধব, পড়শি, আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে যারা বয়স্ক তাদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখুন।

২. মোবাইলে, ফোনে, মেসেজে, ভিডিও কলে তাদের সাথে আলাপ করুন। এতে ইমোশন ভেন্টিলেশন হবে। মন হালকা হবে।

৩. তারা কেমন আছেন, কি করছেন,  তাদের সুবিধা-অসুবিধা জেনে নিন।  তাদের রুটিন কিভাবে সহজ, স্বাস্থ্যকর  ও আরামপ্রদ করা যায় সে বিষয়ে পরামর্শ দিন।  কৌশল বাতলে দিন।

৩. এসময় শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য বাড়ির উঠোনে কিংবা ছাদে স্বাভাবিক কার্যক্রম যেমন- হাঁটাহাঁটি, ব্যায়াম, বাগান পরিচর্যা, গান শোনা, বইপড়া, ইনডোর গেমস (লুডু, দাবা, কার্ড  কেরাম খেল) সুডোকু ইত্যাদি খেলার মাধ্যমে অবসর কাটাতে উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে।

৪. মানসিক প্রশান্তির জন্য শিথিলায়ন, যোগ ব্যায়াম, মেডিটেশন, ধর্মীয় প্রার্থনা অব্যর্থ উপায় হতে পারে।

৫. জরুরি প্রয়োজনে তাদের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যেন নিশ্চিত হয় সে ব্যাপারে সজাগ থাকুন। হটলাইন নাম্বার দিয়ে রাখুন। বিভিন্ন অনলাইন ভিডিও শেয়ার করতে পারেন। এমনকি সুযোগ থাকলে অনলাইনে বা ভিডিও কলে চিকিৎসকের সাথে যুক্ত করে দিন। কাউন্সেলিং নিতে পারেন।

৬. উদ্ভুত পরিস্থিতিতে তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে তাদের কাছে পরামর্শ চান। এতে তারা সম্মানিত বোধ করবেন। মূল্যায়িত হচ্ছেন মনে করবেন। তাদের আত্মবিশ্বাস ও সেলফ এস্টিম বাড়বে। যা তাদের বিষণন্নতা কাটাতে কাজ করবে।

৭. তাদের অতীতের কৃতিত্ব, আপনার প্রতি তাদের ভালোবাসা, ত্যাগ কিংবা সহযোগিতার কথা অকপটে স্বীকার করুন। ধন্যবাদ দিন। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন।

৮. কিছু না পারলেও স্বাভাবিক ও সাধারণ যোগাযোগ অব্যাহত রাখুন। সালাম দিন। মুচকি হাসি দিয়ে কুশল বিনিময় করুন। আপনি তাদের সাথে আছেন এই ভরসা তাদের মানসিকভাবে শক্ত রাখতে সাহায্য করবে।

কোভিড-১৯ মহামারী চলাকালীন সময়ে আসলে সবারই শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা জরুরি। এবং সেখানেই সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে। আজ আমরা শুধু বয়োবৃদ্ধদের বিষয়ে খানিক আলোকপাত করলাম। সবাই নিরাপদে থাকুন। বসায় থাকুন। সতর্ক থাকুন। সামাজিক দূরত্ব মেনে চলুন। আমাদের সামাজিক দূরত্ব যেন মানসিক দূরত্বের কারণ না হয়।

ডা. বাপ্পা আজিজুল

রেসিডেন্ট, সাইক্রিয়াট্রি বিভাগ

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ

আপনার মতামত দিন :