আমেরিকায় আইসিইউ যেন কসাইখানা, মরছে নার্স-ডাক্তাররা

নিউজ নিউজ

ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩:৪২ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ৩, ২০২০

ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের করোনা পরিস্থিতি। ক্রমেই মৃত্যুপুরী হয়ে উঠছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেশ। উপচে পড়ছে হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ড। কোয়ারেন্টাইন সেন্টারগুলিতে ঠাসাঠাসি ভিড়। আইসিইউ যেন কসাইখানা, বলছেন নিউ ইয়র্কের ডাক্তার, নার্সরা। কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা করতে করতে প্রাণ যাচ্ছে ডাক্তার-নার্সদের। সংক্রামিত শত শত স্বাস্থ্যকর্মী, প্যারামেডিক স্টাফ। দমবন্ধ আইসোলেশন ওয়ার্ডে ২৪ ঘণ্টা মৃত্যুর আতঙ্ক।

যুক্তরাষ্ট্রে মারণ এই ভাইরাসে সংক্রামিতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১ লক্ষ ৬৪ হাজার ৩৫৯ জন। মৃত্যু হয়েছে ৩,১৭৩জনের। আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। ২৪ ঘণ্টায় নতুন আক্রান্ত অন্তত ৫১৫ জন। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির এক মেডিক্যাল সার্জন বলছেন, ‘ইনটেনসিভ-কেয়ার ইউনিটের অবস্থা ভয়াবহ। সেখানেও উপচে পড়ছে রোগীদের ভিড়। সংক্রামিতদের সংস্পর্শে থাকা অধিকাংশ নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদেরই প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই। চিকিৎসা করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অনেকেই।’

ম্যানহাটানের ওয়েল কর্নেল মেডিক্যাল সেন্টারের এক ডাক্তার বলছেন, ৩০-৩৫ বছর বয়সী নার্সরাও আক্রান্ত কোভিড-১৯ সংক্রমণে। এরই মধ্যেই দু’জন নার্সের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত অনেকে। তাদের চিকিৎসার জন্য আর জায়গা বা সরঞ্জাম কোনওটাই নেই। অসুস্থ শরীরেই রোগীদের সেবা করে যাচ্ছেন তারা।

মাউন্ট সিনাই ওয়েস্টের এমার্জেন্সি রুমের অভিজ্ঞ নার্স কিওস কেলির মৃত্যু অনেক প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল। দিনরাত করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা করতে গিয়ে কোভিড-১৯ সংক্রমণের উপসর্গ দেখা দিয়েছিল ৪৪ বছরের কেলির শরীরে। সংক্রমণ এতটাই মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল যে মাত্র দশ দিনেই মৃত্যু হয় ওই নার্সের। মাউন্ট সিনাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টা ধামাচাপা দিতে চাইলেও খবর সামনে আসে যে, ওই হাসপাতালের যতজন ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংস্পর্শে এসেছিলেন কেলি তাদের মধ্যেও চেপে বসেছে মৃত্যুভয়। এরই মধ্যেই কোভিড-১৯ পজিটিভ এক ডাক্তারের শরীরে। উপসর্গ দেখা দিয়েছে কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মীর।

মার্কিন সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল জানাচ্ছে, নিউইয়র্কে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৬৭ হাজার। ক্রমেই ভাইরাস সংক্রমণের এপিসেন্টার হয়ে উঠছে নিউইয়র্ক সিটি। জরুরি বিভাগ, আইসিইউ সব জায়গায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে হুহু করে। স্যানিটাইজ করার লোকও মিলছে না। জ্যাকোবি মেডিক্যাল সেন্টারের নার্স থমাস রিলে বলেছেন, ‘রোগীদের চিকিৎসার জন্য নয়, মনে হচ্ছে কসাইখানায় বলি হতে পাঠানো হচ্ছে আমাদের।’ স্বামীর সঙ্গে কোভিড-১৯ পজিটিভ তিনিও।

নিউইয়র্কের সবকটি হাসপাতাল-নার্সিংহোমের ছবিটা একই। মোন্টেফিওর মেডিক্যাল সেন্টারের নার্স বেন্নি ম্যাথিউ বলেছেন, ‘ইমার্জেন্সি রুমে যেন তাণ্ডব করছে ভাইরাস। মনে হচ্ছে আমাদের সকলের শরীরেই ছড়িয়েছে সংক্রমণ। ভয় পাচ্ছি আমার স্ত্রী ও দুই মেয়েও আক্রান্ত কিনা।’ বেন্নির অভিযোগ, সংক্রামিতদের চিকিৎসার জন্য বিশেষ পোশাক, মাস্ক, হাই-ফ্লো অক্সিজেন মাস্ক পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই। হাসপাতালের ঘর সেভাবে স্যানিটাইজ করাও হচ্ছে না। অথচ ২৪ ঘণ্টা সংক্রামিত রোগীদের সঙ্গেই থাকতে হচ্ছে স্বাস্থ্যকর্মীদের। মৃত্যুভয় গ্রাস করেছে সকলকেই।

আমেরিকান কলেজ অব ইমার্জেন্সির প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম পি জ্যাকিস বলেছেন, ‘শহরের সব জায়গায় ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীদের অবস্থা সঙ্কটজনক। আর কিছুদিনের মধ্যেই হাসপাতাল-নার্সিংহোমগুলিতে রোগী রাখার জায়গা পাওয়া যাবে না। চিকিৎসার জন্য থাকবেন না ডাক্তার-নার্সরা। কী ভয়ানক সময় আসতে চলেছে সেটা বুঝতে পারছে না সরকার।’

নিউইয়র্ক সিটি মেয়র বিল-দে ব্লাসিও আগেই বলেছিলেন, নিউ ইয়র্কের পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। বরং সংক্রমণ বেড়েই চলেছে পাল্লা দিয়ে। আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থার অভাবও রয়েছে। মেয়রের কথায় এমন চলতে থাকলে  খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাবে ভেন্টিলেটর, হাই-ফ্লো অক্সিজেন মাস্ক। মিলবে না সার্জিক্যাল মাস্কও। তারপর রয়েছে আইসোলেশন বেডের ঘাটতি। শহরের সব হাসপাতাল-নার্সিংহোমগুলিতে আইসোলেশন ওয়ার্ড বানানোর মতো সরঞ্জাম নেই। যে কটা আইসোলেশন ওয়ার্ড রয়েছে তাদেও বেডের সংখ্যা কম। মেয়রের দাবি, আক্রান্তদের চিকিৎসা সেভাবে করা যাচ্ছে না। তাছাড়া সংক্রমণ সন্দেহে আসা রোগীদের জন্য কোয়ারেন্টাইন সেন্টারও কম রয়েছে। এমন সঙ্কট চলতে থাকলে আরও বেশি মানুষ মরবে নিউইয়র্কে।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়াতে শুরু করার পরেও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি সরকারের পক্ষ থেকে। অবাধে চলেছে সামাজিক মেলামেশা। ঠিক যেমনটা হয়েছে ইতালি, স্পেনে। যার কারণেই এত বেশি ছড়িয়ে পড়েছে সংক্রমণ। মার্কিন জনগণের ৪৩ শতাংশকে এখন ঘরবন্দি থাকার কথা বলা হয়েছে। বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থার অভাব এখনও রয়েছে। তাদের থেকেও সংক্রমণ সুস্থ হয়ে উঠতে থাকা রোগীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে কি-না সে ভয়ও পাচ্ছেন ডাক্তার, নার্স ও হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীরা।

সূত্র- নিউইয়র্ক টাইমস।

আপনার মতামত দিন :