করোনা মোকাবিলায় এডহক ভিত্তিতে হলেও টেকনোলজিষ্ট নিয়োগ জরুরি : পরীক্ষার পরিধি বাড়লেও দক্ষ জনবলের সংকট

নিউজ নিউজ

ডেস্ক

প্রকাশিত: ৪:২২ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ৭, ২০২০

নভেল করোনা ভাইরাস (কভিড-১৯) পরীক্ষার জন্য পিসিএল ল্যাব দেশে সম্প্রসারণ করলেও সেখানে পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল নেই। বিশেষ করে যারা নমুনা সংগ্রহ এবং পরীক্ষা করার কাজে নিয়োজিত প্রশিক্ষিত দক্ষ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট দেশে নেই। শুধু তা-ই নয়, বর্তমানে পিসিআর ল্যাব তৈরির জন্য সরকার যেসব প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারণ করেছে সেখানে দ্রæত গতিতে বায়োসেফটি লেভেল-২ (বিএসএল) ল্যাব তৈরি করা দরকার। এগুলো নিশ্চিত ছাড়া পরীক্ষা কার্যক্রমে যাওয়া টেকনোলজিষ্টদের নিজের ও পরিবারের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

জানা গেছে, করোনা ভাইরাস পরীক্ষার জন্য দেশের একমাত্র ল্যাবরেটরি ছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত¡, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআরের। দেশে নভেল করোনা ভাইরাস রোগী সনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। গত শুক্রবার পর্যন্ত সারা দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী সনাক্ত ছিল ৬১ জন। মাত্র দুইদিনে রোগী বেড়েছে ২৭ জন। সরকার বিপুল সংখ্যক মানুষের পরীক্ষার জন্য রাজধানীর নয়টি প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারণ  করেছে । কিন্তু সেখানে বায়োসেফটি লেভেল-২ (বিএসএল) মানের ল্যাব তৈরি হয়নি। এসব ল্যাবে নেই প্রশিক্ষিত জনবলও। ফলে করোনা ভাইরাসের মতো সস্পর্শকারত একটি ভাইরাসের পরীক্ষা করার মতো মানসিকভাবেও স্বাস্থ্যকর্র্মিরা প্রস্তুত নন। শুধু তাই নয়, তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত পারসোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই) ছিল না শুরুতে। এখন পর্যাপ্ত পিপিই সংগ্রহ করা হলেও তাদের মান নিয়ে খোদ স্বাস্থ্যকর্মিদেরই প্রশ্ন রয়েছে। কারণ পিপিইর মাস্ক এন-৯৫ মানের হওয়ার কথা থাকলেও ভেতরে তা পাওয়া যাচ্ছে না বলে অনেকেই অভিযোগ করছেন।

সম্প্রতি রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালকে করোনা ভাইরাস পরীক্ষার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এখানে পিসিআর ল্যাব তৈরির মতো এখনো স্থান নেই। নমুনা সংগ্রহের জন্য হাসপাতালে দুটি কক্ষ নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র। এই প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত সংখ্যক মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট নেই।  যারা রয়েছেন তারাও মানসিকভাবে প্রস্তত নয়। এক ধরণের জোর করেই অনেককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের মেডিকেল টেকনোলজিষ্টরা নমুনা সংগ্রহের জন্য তারা দুই ঘন্টা করে হাসপাতালের নির্ধারিত কক্ষে দায়িত্ব পালন করবেন। সেখান থেকে নমুনা সংগ্রহ  করে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ল্যাবে পাঠানো হবে।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল ল্যাবরেটরি অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল খায়ের মোহাম্মদ শামসুজ্জামান আজকালের খবরকে বলেন, দেশে মেডিকেল টেকনোলজিষ্টের ব্যাপক সঙ্কট রয়েছে। এই সঙ্কট কাটাতে অতি দ্রæত সময়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া দেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মেডিকেল টেকনোলজিষ্টদের এখানে সম্মানি ভিত্তিতে স্বল্প সময়ের জন্য নিয়োগ করা যেতে পারে। তাহলে নমুনা সংগ্রহ সহজতর হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাগেছে, সারা দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মোট মেডিকেল টেকনোলজিষ্টদের পদ রয়েছে ছয় হাজারের মতো। বর্তমানে দেশে কর্মরত রয়েছে আড়াই থেকে তিন হাজারের মতো। অবশিষ্ট পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এছাড়া ১৯৮৫ সালের নিয়োগবিধি অনুযায়ী জনবল তৈরি রয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোতে।  অর্থাৎ দেশের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান ১৯৮৫ সালের জনবল দিয়ে পরিচালিত হয়ে আসছে। মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট নিয়োগ অচিরেই দেওয়া না হলে নভেল করোনা ভাইরাস পরীক্ষার জন্য লোকবল সঙ্কট তীব্র হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী, স্বাস্থ্য খাতে জনবল প্রয়োজন ১:৩:৫। অর্থাৎ একজন চিকিৎসকের সঙ্গে দুইজন নার্স ও পাঁচজন টেকনোলজিস্ট বা অন্যান্য স্টাফ প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশ এই সূত্রের বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। দেশের একটি উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে চিকিৎসক রয়েছেন ৩০ জন। অথচ সেখানে মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট রয়েছেন মাত্র তিনজন। ফলে রোগ নির্ণয় ব্যাহত হচ্ছে। আর এই সুযোগে দেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো মোটা অংকের ফি আদায় করে রোগ নির্ণয় করছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মুহাম্মদ মাহবুব হাসান বলেন, নভেল করোনা ভাইরাস পরীক্ষার জন্য একটি পিসিএল ল্যাব দরকার। পিসিএল ল্যাবে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার কাজে নিয়োজিত থাকা দরকার কমপক্ষে ১৪ জন মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট। কারণ একজন টেকনোলজিষ্ট একদিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক নমুনা সংগ্রহ করতে পারবেন। ওই টেকনোলজিষ্টকে আগামি ১৩ দিন কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হবে। কারণ নমুনা সংগ্রহ বা পরীক্ষার সময় তিনি সংক্রমিত হয়েছেন কি- না তা নিশ্চিতের জন্য তাকে ১৪ দিনের জন্য আইসোলেশনে রাখা দরকার। কিন্তু দেশে সে পরিমাণ মেডিকেল  টেকনোলজিষ্ট নেই। যারা পরীক্ষার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হচ্ছেন তারা একদিকে যেমন নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছেন, অপরদিকে তার পরিবার-পরিজনের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, টেস্ট ফ্যাকাল্টি থেকে পাশ করা দেশে বর্তমানে ১৫-২০ হাজার মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট সরকারি চাকরি না পেয়ে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বল্প বেতনে কাজ করছেন। অপরদিকে কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের অধীনে প্রায় ৬০০টির মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। সেখানেও টেকনোলজিষ্ট তৈরি হচ্ছে। তবে তাদের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারিগরিতে একাধিক মামলায় আটকে রয়েছে নিয়োগ প্রক্রিয়া। দেশের অনেক প্রতিষ্ঠানে মেডিকেল টেকনোলজিষ্টদের পদ শূণ্য থাকলেও সেখানে নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না। দেশের অনেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৩১ শয্যা থেকে বাড়িয়ে ৫০ ও ৫০ শয্যার হাসপাতাল ১০০ শয্যা করা হয়েছে। সেখানে চিকিৎসক, নার্স নিয়োগ দেওয়া হলেও রোগ নির্নয়ের কাজে নিয়োজিতদের পদ বাড়ানো হয়নি। অথচ হাজার হাজার যুবক-যুবতী টেস্ট ফ্যাকাল্টি থেকে পাশ করার পরও বেকার হয়ে  রয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথলজি বিভাগের প্রধান মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট আলমাস উদ্দিন জানান, কভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য বঙ্গবন্ধুতে পিসিআর ল্যাব থাকলেও সেখানে আইসোলেশন কক্ষ ছিল না। তাদের মেডিকেল টেকনোলজিরও অভাব রয়েছে। কভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রশিক্ষিত জনবল নেই। সরকারকে দ্রæত অ্যাডহক ভিত্তিতে মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। যারা পরীক্ষার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন তাদেরকে কোনো নির্দিষ্ট স্থানে আলাদা আলাদা করে রাখা উচিত। যাতে তাদের মাধ্যমে তার ও পরিবারে এটি না ছড়ায়।

দেশে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। এই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল সংখ্যক প্রবাসী দেশে ফেরেন। তাদেরকে হোম কোয়ারেন্টাইন ও প্রতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখা হলেও অনেকেই তা মানেননি। ফলে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দেশে বাড়তে থাকে। রবিবার  ( ৫ এপ্রিল) পর্যন্ত সারা দেশে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৮৮ জন। এদের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৩৩ জন ও মারা গেছেন নয়জন। করোনা ভাইরাস যাতে মহামারি আকারে ছড়াতে না পারে সেজন্য সারাদেশে সশস্ত্র বাহিনী নিয়োগ করে সরকার। তাদের কঠোর অবস্থানের ফলেও অনেকে জীবিকা কিংবা অন্যান্য কারণে ঘর থেকে বের  হচ্ছেন। সরকার দেশের সরকারি-বেসরকারি সব ধরণের অফিস আদালত গত ২৬ মার্চ থেকে ছুটি ঘোষণা করে । যা আগামি ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত বহাল থাকবে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ) হাবিবুর রহমান ম খান আজকালের খবরকে বলেন, নানা জটিলতার কারণে মেডিকেল টেকনোলজিষ্টদের নিয়োগ প্রক্রিয়া থেমে যায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিয়োগের চেষ্টা করা হচ্ছে। দেশের সবগুলো বিভাগীয় শহরে করোনা ভাইরাস পরীক্ষার জন্য ল্যাব তৈরি করা হচ্ছে। নমুনা সংগ্রহের জন্য টেকনোলজিষ্টদের ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

আপনার মতামত দিন :