কনভালেসেন্ট প্লাজমা থেরাপি: করোনাভাইরাসে আক্রান্ত গুরুতর রোগীর চিকিৎসা প্রসঙ্গ

নিউজ নিউজ

ডেস্ক

প্রকাশিত: ৮:৩৭ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২০, ২০২০

চীনে গত জানুয়ারি মাসের ২৩ থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের ১৯ তারিখ পর্যন্ত গবেষণাকালীন সময় গুরুতর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ১০ জন রোগীর উপরে কনভালেসেন্ট প্লাজমা থেরাপির দেবার পর বেশ ভালো ফলাফল পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত ১০ জন রোগীর কেউ মৃত্যুবরণ করেননি এবং অতি দ্রুত তারা এই রোগমুক্ত হয়েছেন।

১. কনভালেসেন্ট প্লাজমা কি?
সাধারণত কোন ব্যক্তি যেকোন ভাইরাসে আক্রান্ত হলে রোগীর শরীরে উক্ত ভাইরাস প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হয় এবং এই এন্টিবডি তৈরি হওয়ার পর রোগী ঐ ভাইরাস থেকে মুক্ত হয় অর্থাৎ রোগী ঐ ভাইরাস ঘটিত রোগ থেকে মুক্ত হয়। এই এন্টিবডি রোগীর রক্তের জলীয় অংশে থাকে। উক্ত ভাইরাস মুক্ত হবার পরে রোগীর শরীর থেকে এন্টিবডি সমৃদ্ধ তার রক্তের জলীয় অংশকে কনভালেসেন্ট প্লাজমা বলে।

২. কেন বর্তমান করোনা ভাইরাস মহামারিতে কনভালেসেন্ট প্লাজমা থেরাপির চিন্তা করা হচ্ছে?
সার্স করোনাভাইরাস ইনফেকশন এবং গুরুতর ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগের ক্ষেত্রে ৩২ টি গবেষণায় কনভালেসেন্ট প্লাজমা থেরাপির বিশেষ উপকার পাওয়া গেছে । তবে ইবোলা ভাইরাসের ক্ষেত্রে তেমন ভালো ফলাফল পাওয়া যায়নি। বিগত দিনের সেসব গবেষণার নিরিখে আশা করা হচ্ছে যে বর্তমানের কোভিড-১৯ মহামারির ক্ষেত্রেও এই বিশেষ থেরাপি ভাল ফলাফল বয়ে আনতে পারে।

বর্তমান গবেষণা:
বর্তমান বৈশ্বিক মহামারি চীন থেকে শুরু হয় এবং চীনেই খুব ছোট পরিসরে একটি গবেষণা করা হয়েছে যার ফলাফল তারা প্রকাশ করেছে। এই গবেষণায় ২০ জন গুরুতর অসুস্থ রোগী বাছাই করে তাদর উপর এই থেরাপি প্রয়োগ করা হয়। রোগীর মধ্যে ১০ জনকে কনভালেসেন্ট প্লাজমা থেরাপি দেয়া হয়। তাদের প্রত্যেককে ২০০ মিলিলিটার প্লাজমা প্রদান করা হয়েছে। আর ১০ জনকে কন্ট্রোল গ্রুপে রাখা হয় যাদেরকে এই প্লাজমা দেয়া হয়নি। সবগুলো রোগীকে সকল ধরনের সাপোর্ট প্রদান করা হয় এবং সাথে এন্টিভাইরাস থেরাপি, এন্টি ব্যাকটেরিয়াল, এন্টিফাঙ্গাল চিকিৎসার সাথে ছয় জন রোগীকে মিথাইলপ্রেডনিসোলন দেয়া হয়। সবগুলো রোগীর সিটি স্ক্যান এ ফুসফুসে রোগের নমুনা বিদ্যমান ছিল।

গবেষণার ফলাফল:
কনভালেসেন্ট প্লাজমা প্রদানের পর যেসব রোগীকে দেয়া হয়নি তাদের তুলনায় যাদেরকে দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে ভাল ফলাফল লক্ষ্য করা গেছে। যেমন:
ক. প্রথম থেকে তৃতীয় দিনের ভিতরে জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট এবং বুকে ব্যাথা দূর হয়। রক্তের অক্সিজেন সেচুরেশন (SaO2) এ উন্নতি হয় এবং আইসিইউ সাপোর্ট কমিয়ে নিয়ে আসা হয়।
খ. সিটি স্ক্যান চেস্ট এর পরিবর্তনগুলো স্বাভাবিক হয়ে আসে।
গ. ল্যাবরেটরি টেস্টে লিম্ফোসাইট বৃদ্ধি হয়, লিভার ফাংশন টেস্ট এর উন্নতি হয়, সিআরপি কমে আসে তবে বিলিরুবিন অপরিবর্তনীয় ছিল।
ঘ. দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় দিনে নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি টাইটার বাড়তে থাকে । প্রথম তিন দিনের মধ্যে ৫ জন রোগীর ভাইরাস নেগেটিভ হয় এবং ষষ্ঠ দিন পর একজন রোগের ভাইরাস নেগেটিভ হয়।

পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া: পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার মধ্যে একজন রোগীর মুখে লাল দাগ দেখা গিয়েছিল।

গবেষণার উপকারিতা সমূহ:
এই গবেষণায় নিম্নলিখিত উপকার সমূহ লক্ষ্য করা যায়। যেমন:
ক. এতে মৃত্যুহার শূন্য ছিল।
খ. অতি দ্রুত নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি টাইটার বৃদ্ধি পেয়েছিল।
গ. অতি দ্রুত ভাইরাস মুক্ত হয়েছিল।
ঘ. কেমন গুরুতর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ছিল না।

গবেষণাটির সীমাবদ্ধতা: 
যদিও এই গবেষণায় বেশ ভাল ফলাফল লক্ষ্য করা গিয়েছে, কিন্তু এর বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। যেমন:
ক. কনভালেসেন্ট প্লাজমা ছাড়াও প্রয়োজনীয় সকল সাপোর্টিভ থেরাপি প্রদান করা হয়। এর মধ্যে এন্টিভাইরাস থেরাপিও ছিল। সেসবের কার্যকারিতা সম্পর্কে তেমন কিছু স্পষ্ট জানা নাই। ফলে যে যেসব ভাল ফলাফল পাওয়া গিয়েছে তা শুধুমাত্র কনভালেসেন্ট প্লাজমা নাকি, অন্য সব থেরাপি, নাকি সবগুলোর সম্মিলিত ফলাফল তা স্পষ্ট নয় ।
খ. রোগ লক্ষণ শুরু হওয়ার বিভিন্ন দিনে কনভালেসেন্ট প্লাজমা থেরাপি দেয়া হয়েছে। ফলে প্লাজমা থেরাপি ঠিক কোন দিনে বা কখন দিলে তা ভাল ফলাফল দিবে তা স্পষ্ট নয়।
গ. খুব কম সংখ্যক রোগীর উপর এই থেরাপি প্রয়োগ করা হয়। ফলে এর ফলাফলের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক পরিসংখ্যান ভিত্তিতে প্রমাণিত বলা যায় না।

উপসংহার:
এই ছোট গবেষণায় খুব ভালো ফলাফল পাওয়া গেছে এবং কম পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়েছে । তবে প্রত্যেক রোগীকে ২০০ মিলি-লিটার প্লাজমা প্রদান করা হয়েছে। এতে আরো বেশি প্রদান করলে এবং রোগ লক্ষণ শুরু হওয়ার কতক্ষনের মধ্যে প্রদান করলে রোগী দ্রুত সুস্থ্য হতো তা বোঝা যায়নি। কাজেই এই পদ্ধতি চিকিৎসা হিসেবে প্রয়োগ করার জন্য আরো বড় গবেষণার দরকার আছে বৈকি।

– ডা. এম. মুর্শেদ জামান মিঞা

আপনার মতামত দিন :