১৬ কোটি মানুষের জন্য ১৪শ’ টেকনোলজিস্ট

নিউজ নিউজ

ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:০৭ পূর্বাহ্ণ, মে ১৪, ২০২০

দেশে ১৬ কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে মেডিকেল টেকনোলজিস্টের পদ রয়েছে মাত্র ২ হাজার ১৮২। এর মধ্যে আবার ৭৬৫টি পদই শূন্য। ১৯৭১ সালের পর ৪৯ বছরে যেমন বাড়ানো হয়নি মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদের সংখ্যা, তেমনি একটি মামলার কারণে গত ৭ বছর ধরে বন্ধ এ সেক্টরে নতুন নিয়োগ।

ফলে করোনা সংক্রমণের ভয়াবহ এ মুহূর্তে যখন রোগীর শনাক্তকরণ চিহ্নিতের উপাদান সংগ্রহে সবচেয়ে বেশি দরকার মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ঠিক সেই মুহূর্তে লোকবল সংকটে চোখে অন্ধকার দেখছে সবাই। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনলাইনে মাত্র দু’দিনের ট্রেনিং দিয়ে রোগীর সোয়াব (নাকের ভেতর থেকে নেয়া করোনা পরীক্ষার উপাদান) সংগ্রহে মাঠে নামানো হয়েছে ইপিআই টেকনিশিয়ানদের। এরাও সংখ্যায় অতি নগন্য। প্রতি উপজেলায় আছেন মাত্র ১ জন।

প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা না থাকা এই ইপিআই কর্মীদের সংগৃহীত সোয়াব কতটা সঠিক হচ্ছে কিংবা সেই সোয়াবে সঠিকভাবে করোনা শনাক্ত হচ্ছে কিনা, সেটা নিয়ে এখন শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে, উপাদান সংগ্রহে দেশজুড়ে চরম লোকবল সংকট চললেও ৭টি সরকারিসহ মোট ৯২টি হেলথ টেকনোলজি ইন্সটিটিউট থেকে ডিপ্লোমা নিয়ে বেকার ঘুরছেন ১ লাখেরও বেশি মেডিকেল টেকনোলজিস্ট। এদের পাশাপাশি আরও অন্তত ৩ হাজার টেকনোলজিস্ট রয়েছেন যারা এ ডিপ্লোমা ডিগ্রি নেয়ার পর ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়েছেন উচ্চতর বিএসসি-এমএসসি সনদ। ২০১৩ সালে দায়ের হওয়া একটি মামলার কারণে সৃষ্টি হয়েছে এ পরিস্থিতি। উচ্চ আদালতের নির্দেশে গত ৭ বছর ধরে দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে বন্ধ রয়েছে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ।

দেশে করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে তা হল করোনা শনাক্তের পরীক্ষা। গোড়ার দিকে যেখানে দেশে মাত্র একটি ল্যাবে হতো এ পরীক্ষা, সেখানে এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি অন্যান্য প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে ৩২টি ল্যাবে চলছে করোনা শনাক্তকরণ। এর মধ্যে বেসরকারি ১০টি প্রতিষ্ঠান এমটি অর্থাৎ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট প্রশ্নে খুব একটা জটিলতায় না থাকলেও বিপাকে পড়েছে প্রায় সব সরকারি প্রতিষ্ঠান।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী যেখানে একজন ডাক্তারের বিপরীতে কমপক্ষে ৫ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট থাকা প্রয়োজন, সেখানে দেশে স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে সবমিলিয়ে টেকনোলজিস্টের পদ রয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৯৯৬টি। স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, এর মধ্যে ল্যাব টেকনোলজিস্ট ২ হাজার ১৮২, ডেন্টাল ৬২৮, ফিজিওথেরাপি ২৯৪, রেডিওথেরাপি ৮৪ এবং রেডিওগ্রাফি টেকনোলজিস্ট ৮০৭ জন। এর মধ্যে বর্তমানে ১ হাজার ৩৯৪টি পদই শূন্য। করোনা শনাক্তের উপাদান সংগ্রহ এবং তা প্রক্রিয়াজাতকরণে মূলত কাজ করেন ল্যাব মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা।

এ খাতে থাকা ২ হাজার ১৮২টি পদের মধ্যে বর্তমানে শূন্য পদের সংখ্যা ৭৬৫। দেশে থাকা জনবল কাঠামো অনুযায়ী প্রতি উপজেলায় মাত্র একটি করে ল্যাব মেডিকেল টেকনলজিস্টের পদ রয়েছে। এছাড়া জেলা হাসপাতাল এবং মেডিকেল কলেজ সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোতে রয়েছে বাকি পদগুলো।

বরিশালে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তাহেরুল ইসলাম বলেন, ‘২০১৩ সালে দায়ের হওয়া একটি মামলার কারণে গত ৭ বছর ধরে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে মেডিকেল টেকনলজিস্ট নিয়োগ বন্ধ। এভাবে হিসাব করলে এই ৭ বছরে ১ লাখ ৬১ হাজার টেকনলজিস্ট ডিপ্লোমা ডিগ্রি নিয়ে বের হলেও তাদের কেউ সরকারি চাকরি পাননি। এদের মধ্যে বেসরকারি ক্লিনিক ও ল্যাবগুলোতে অত্যন্ত নিু বেতনে ৬০ হাজারের মতো টেকনোলজিস্টের কর্মসংস্থান হলেও বেকার রয়েছেন ১ লাখেরও বেশি।

সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হল চিকিৎসাসেবা প্রশ্নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও গত ৪৯ বছরে মেডিকেল টেকনোলজিস্টের পদসংখ্যা একটিও বাড়েনি। এমনকি যারা বিএসসি এমএসসি করে বসে আছেন তাদের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোনো পদ পর্যন্ত নেই। অথচ রোগ নির্ণয়ের প্রাথমিক শর্ত যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা তার উপাদান রোগীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করেন এই টেকনোলজিস্টরা। আজ করোনার ভয়াবহতার কারণে যখন স্বাস্থ্য খাত নিয়ে এত লেখালেখি ঠিক তখনই বিষয়টি সামনে এলো। অথচ বছরের পর বছর এ নিয়ে আমরা আন্দোলন সংগ্রাম করলেও আমাদের কথা কেউ কানে তোলেনি।’

এদিকে টেকনোলজিস্ট সংকটের কারণে করোনা সন্দেহে থাকা রোগীদের শনাক্তকরণ উপাদান সংগ্রহে মাঠে নামানো হয়েছে ইপিআই টেকনিশিয়ানদের। স্বাস্থ্য বিভাগের ভাষায় যাদের বলা হয় এমটিইপিআই। স্বাস্থ্য সহকারী পদে কর্মরতরা পদোন্নতি পেয়ে আসেন এ পদে। যদিও এদের টেকনোলজিস্ট প্রশ্নে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সহকারী পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল জানান, ‘অনলাইনে দু’দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে সোয়াব সংগ্রহে মাঠে নামানো হয়েছে তাদের। তারাই মূলত সন্দেহজনক করোনা রোগীর নাক থেকে সংগ্রহ করছেন এ নমুনা। পরে তা পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে করোনা শনাক্তকরণের পিসিআর ল্যাবে।’

বরিশাল শেরেবাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ে স্থাপিত পিসিআর ল্যাবের প্রধান ডা. আকবর আলী বলেন, ‘আমি আসলে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। আমাদের কাছে জেলা-উপজেলা থেকে যেসব নমুনা আসে সেগুলো আমরা পরীক্ষা করে দেখি যে তাতে করোনা আছে কী নেই। এখন কোন নমুনা সঠিক কিংবা কোনটা সঠিক নেই, তা বলা সম্ভব নয়।’ বরিশালের মুলাদী উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমার উপজেলায় কোনো মেডিকেল টেকনলজিস্ট নেই। ইপিআই টেকনিশিয়ানদের দিয়েই সোয়াব সংগ্রহ করি আমরা।

এছাড়া তো আর কোনো উপায়ও নেই।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘একজন মেডিকেল টেকনলজিস্টকে কমপক্ষে ৩ বছর পড়াশোনা করে ডিপ্লোমা ডিগ্রি নিতে হয়। সেখানে ইপিআই টেকনিশিয়ান তো একটি প্রমোটেড পদ। এছাড়া তাদের এ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষাও নেই।’

সৌজন্যে : যুগান্তর।

আপনার মতামত দিন :