আউটসোর্সিং না শূন্য পদে : সিদ্ধান্তহীনতার কবলে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ প্রক্রিয়া

নিউজ নিউজ

ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২:২১ অপরাহ্ণ, মে ১৪, ২০২০

দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে ফ্রন্টলাইনার হিসেবে আলোচনায় মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা। মহামারি কোভিড-১৯ সংক্রমণ ঠেকাতে টেকনোলজিস্টরাও সামনে থেকে লড়ছেন। মাঠ পর্যায়ে ঘরে ঘরে গিয়ে ভাইরাসটির নমুনা সংগ্রহ করে তারা পরীক্ষার কাজ করছেন। করোনার এই দুর্যোগে এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশার লোকদের যেখানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেখানে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট সঙ্কট পিছু ছাড়ছে না। আর এ সঙ্কটের ফলে করোনার বয়স আড়াই মাস চললেও ভাইরাসটির নমুনা সংগ্রহে বেগ পেতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত লোকবলের অভাবে কোভিডের অধিক নমুনা গ্রহণে হিমশিম খাচ্ছেন দায়িত্বরত টেকনোলজিস্টরা।
করোনার স্যাম্পল কালেকশনে এই যখন অবস্থা, তখন আলোচনায় মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ। কিন্তু এখনও তা দরকষাকষির মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। ফাইল চালাচালি চলছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে স্বাস্থ্য অধিদফতরে। বহুদিন ধরে প্রক্রিয়াধীন থাকা এ নিয়োগ আলোর মুখ দেখছে না। এ দিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার সংক্রমণের এই টার্নিং সময়ে নমুনার সংখ্যা না বাড়লে ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন হতে হবে। কেননা, যত নমুনা বাড়ানো যায়, তত দ্রæত শনাক্ত করে পজিটিভ কোভিড রোগীকে আলাদা করে দিতে হবে। আর তা করতে ব্যর্থ হলে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপক আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে সব মহল থেকে সহসাই মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগের তাগিদ অনুভব করলেও স্বাস্থ্য অধিদফতর করোনা শুরু থেকেই বলছে ‘বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন’। অধিদফতর চাইছে করোনা প্রতিরোধে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে টেকনোলজিস্ট নিয়োগ করতে। কিন্তু এই নিয়োগ প্রক্রিয়া অস্থায়ী উল্লেখ করে প্রতিবাদ করছেন টেকনোলজিস্টদের সংগঠন ও এর নেতাকর্মীরা। তাদের দাবি, এই নিয়োগে চাকরির সুরক্ষা নেই। এ প্রক্রিয়ায় বঞ্চিত হবেন যোগ্য ও দক্ষ কর্মীরা। কেননা, সরকার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেবে বিভিন্ন প্রকল্প ও কোম্পানি থেকে। এর ফলে যারা দীর্ঘদিন বেকার হয়ে স্থায়ী নিয়োগের অপেক্ষায় আছেন তারা বাদ পড়বেন।

আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করতে লকডাউনের মধ্যেই রমজানের শুরুর দিকে বিক্ষোভ করেছেন তারা। মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের কার্যালয়ের সামনে শুয়ে তারা নিজেদের দাবি তুলে ধরেন।

বঙ্গবন্ধু মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পরিষদের (বিএমপিটি) সাধারণ সম্পাদক মো. আশিকুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, আমাদের শূন্য পদ আছে প্রায় ২ হাজার ৭০০। সরকার তাদেরকে নিয়োগ না দিয়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পথে হাঁটছে। এই প্রক্রিয়ায় একবার নিয়োগ হলে সরকার চাইবে প্রতিবার এভাবেই নিয়োগ দিতে। আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগ ১ বা ২ বছরের জন্য হয়ে থাকে। এখন ১২ বছর ধরে সরকারি নিয়োগের বাইরে থাকা ভুক্তভোগীদের দাবি না মানলে তারা কর্মবিরতিতে যাবেন। পরে পরিস্থিতি আরও প্রকট হবে। কেননা, প্রতি উপজেলায় নমুনা সংগ্রহের জন্য মাত্র একজন টেকনোলজিস্ট নিয়োজিত আছেন। যা চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল।

সরকারের রোগতত্ত, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) অধীনে করোনার নমুনা সংগ্রহের কাজ করছেন সিনিয়র টেকনোলজিস্ট মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তিনি বলেন, আমরা সম্মুখে থেকে লড়াই করছি। ঝুঁকি নিয়ে কোভিড-১৯-এর নমুনা সংগ্রহের পুরো কাজটি করে যাচ্ছি। এখন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ হলে কোনো সরকারি সুযোগ সুবিধা পাওয়া যাবে না। আমরা বেতন বোনাসসহ যেসব সুযোগ পাচ্ছি, আউটসোর্সিংয়ের নিয়োগপ্রাপ্তরা সে সুবিধা পাবে না। এতে আমাদের প্রশিক্ষিত ও কর্মঠ কর্মীরা বঞ্চিত হবে।

জানা যায়, আলাদতের বেড়াজালে পড়ে প্রায় এক যুগ ধরে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ বন্ধ আছে। ফলে এই পেশায় শূন্য পদ সৃষ্টি হয়েছে। বেকার আছেন প্রায় ৪০ হাজার দক্ষ টেকনোলজিস্ট। করোনার পর থেকে বাস্তব পরিস্থিতি ও সঙ্কটে সবার চাপের মুখে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যেতে বাধ্য হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। গত ২৮ এপ্রিল ৩৮৬ জনের আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। তবে পুরো নিয়োগ কার্যটি কোন প্রক্রিয়ায় করলে সুবিধাজনক হয়, মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তা জানতে চাওয়া হয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের কাছে।

সূত্র জানায়, গেল ১০ মে টেকনোলজিস্ট নিয়োগ প্রক্রিয়া মর্মে অধিদফতরকে একটি চিঠি দেয় মন্ত্রণালয়। যার মতামতও দিয়েছে অধিদফতর। তারা মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে, এই পরিস্থিতিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগই যথোপযুক্ত হবে। এই দুর্যোগে স্থায়ী নিয়োগ সম্ভব নয়। এই প্রক্রিয়ায় হাঁটলে সরকারকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে।

যদিও অধিদফতরের পরিচালক (নিয়ন্ত্রণ কক্ষ) ডা. আশেয়া আক্তার সময়ের আলোকে বলেন, প্রথমে আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগের কথা বলা হয়েছিল। পরে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে স্থায়ী নিয়োগের ব্যাপারে কাজ চলছে। অধিদফতর থেকে সব ফাইল চলে গেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। দ্রæত নিয়োগের জন্য চেষ্টা চলছে। তবে পুরো বিষয়টি অধিদপতরের পরিচালক (প্রশাসন) বলতে পারবেন।

পরে বিষয়টি জানতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তার পক্ষে একজন জানান, তারা এখনও মন্ত্রণালয় থেকে নিয়োগের কোনো অনুমোদন পাননি। কোন প্রক্রিয়ায় মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ হবে, তাও পরিষ্কার করেননি তিনি।

আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণাললের মিডিয়া সেলের আহবায়ক ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হাবিবুর রহমান খান সময়ের আলোকে বলেন, আমরা মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগের প্রচেষ্টায় আছি। আউটসোর্সিং না স্থায়ী নিয়োগ হবে তার স্পষ্ট জবাব দেননি তিনি। জানান, কাজ চলছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্তহীনতায় বিভক্তি দেখা দিয়েছে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের সংগঠনের নেতাদের মধ্যে। মঙ্গলবার বঙ্গবন্ধু মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পরিষদ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, তাদের সভাপতি মোশাররফ হোসেন সংগঠনের কর্মীদের কথা বিবেচনা না করে ‘ষড়যন্ত্রে’ লিপ্ত হওয়ায় তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাদের দাবি, বহিষ্কৃত সভাপতি মন্ত্রণালয়ের আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজি হয়েছেন। কিন্তু অন্যরা রাজস্ব খাতে স্থায়ী নিয়োগের দাবিতে অনড়।

সৌজন্যে : সময়ের আলো।

আপনার মতামত দিন :