গর্ভকালীন সময়ে কোমর ব্যথা : কারণ ও করণীয়

নিউজ নিউজ

ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২:৪৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১০, ২০২০

গর্ভাবস্থায় কোমর ব্যথা একটি অতি সাধারণ সমস্যা। গর্ভবতী নারীদের কোনো না কোনো সময় গর্ভাবস্থার কারনে কোমর ব্যথার হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি চার নারীর তিন জন গর্ভাবস্থায় কোমর ব্যথায় ভুগে থাকেন। এ সমস্যা সাধারণত গর্ভাবস্থার শেষ দিকে, বিশেষ করে তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে বেশি দেখা যায়। মায়ের জরায়ুর যে পাশে বাচ্চা অবস্থান করে, সেদিকে ব্যথা বেশি অনুভূত হয়। গর্ভাবস্থায় এ ধরনের ব্যথা কারও জন্য তেমন সমস্যার কারণ না হলেও কারও জন্য এটা মারাত্মক হয়ে ওঠে। কোমর ব্যথার কারণে চলাচল করতে কষ্ট হয়, রাতে ঘুম আসে না আবার অনেকের সারা রাত পিঠে বালিশ দিয়ে বসে কাটাতে হয়। গর্ভাবস্থায় কোমর ব্যথায় বড় ধরনের ক্ষতি না হলেও মা ও সন্তানের জন্য এটি বিরক্তিকর হতে পারে। কিছু উপায় রয়েছে যা আপনাকে ও আপনার সন্তানকে কোনো কষ্ট না দিয়ে ব্যথা উপশম করতে সাহায্য করবে।

কোমর ব্যথার কারনঃ

১. বাচ্চার অবস্থানঃ গর্ভাবস্থায় শেষের দিকে বাচ্চার অবস্থানের ওপর নির্ভর করে মায়ের স্নায়ুর ওপর চাপ পড়তে পারে যার কারণে কোমর ব্যথা হয়

২. শরীরের ওজন বৃদ্ধি কারনে

৩. হরমোনের পরিবর্তনের কারনে

৪. অধিক সময় শুয়ে থাকা কারনে

৫. জরায়ু বড় হওয়ায় মায়ের শরীরের ভরকেন্দ্র পরিবর্তিত হয়, কোমরের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে; কোমর ব্যথার এটিও একটি কারন

৬. মাতৃত্বকালীন মানসিক দুশ্চিন্তা/ স্ট্রেসও কোমর ব্যথার কারন

৭. .গর্ভাবস্থায় কোমর ব্যথা হওয়ার আরেকটি কারন সায়াটিক নার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ। এ সময় বড় হয়ে যাওয়া জরায়ুর চাপ যখন শরীরের দুটি সায়াটিক নার্ভের ওপর পড়ে। তখন কোমরে, উরুতে ব্যথা হতে পারে। ব্যথা কখনও কখনও পায়ের দিকে ছড়িয়ে পরতে পারে

৮. গর্ভবতী মায়েরা সাধারণত ঝুঁকে থাকেন। এতে মেরুদণ্ডের ওপর আরও চাপ পড়ে

৯. একটানা অনেকক্ষণ বসে থাকলে বা দাঁড়িয়ে থাকলে অথবা ভারি কিছু তুললে কোমর ব্যথা হতে পারে

গর্ভকালীন সময় কোমর ব্যথা কারনে য়ে সমস্যাগুলো দেখা দেয়ঃ

১.গর্ভধারণের সময় হরমোনাল পরিবর্তনের কারনে কোমরের বিভিন্ন জয়েন্ট ও লিগামেন্ট নরম এবং ঢিলা হয়ে যায়, ফলে

– মায়ের শরীর অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে

– জয়েন্টের ভার বহন ক্ষমতা কমে যায়

– হাঁটার সময়, বসে থাকলে, কোনো কিছু তোলার
সময় ব্যথা অনুভূত হতে পারে

-সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠার সময়

-নিচু চেয়ার থেকে ওঠার সময়

– সামনের দিকে ঝুঁকে চেয়ারে বসে থাকলে
কোমর ব্যথার ঝুঁকি বেড়ে যায়

করণীয় :

১. গর্ভাবস্থায় কোমর ব্যথা দূর করার কার্যকর উপায় হলো ব্যায়াম, যা নিজের পেশি শক্তিশালী করার পাশাপাশি গর্ভস্থ শিশুকে বহন করার শক্তি জোগায় যেমন-
– হাঁটা,
– সাঁতার কাটা
– আস্তে আস্তে সাইকেল চালানো

২.হাই হিল এবং একেবারে ফ্ল্যাট জুতো- দুটোই শরীরের ওজনের ভারসাম্য নষ্ট করে। হালকা উঁচু নরম সোলের জুতো ব্যবহার করতে হবে।

৩. চিত হয়ে না শুয়ে কাত হয়ে শুতে চেষ্টা করুন। দুই পায়ের মাঝখানে এবং পিঠের নিচে বালিশ দিয়ে ঘুমালে মেরুদণ্ডের চাপ কম পরবে।

৪. গরম ও ঠান্ডা পানির সেঁক নিতে পারেন। তবে পানির তাপমাত্রা যেন সহনীয় থাকে।

৫. নিচু হয়ে ঝুঁকে কোনো কাজ করা যাবে না। সোজা দাঁড়িয়ে বা বসে কাজ করুন। ভারী কিছু ওঠাবেন না।

৬. যোগব্যায়াম ব্যথা কমাতে সাহায্য করে, পিঠে ও কোমরে হালকা ম্যাসাজও করা যেতে পারে।

৭. যতক্ষণ বসে থাকবেন ততক্ষণ সোজা হয়ে থাকার চেষ্টা করুন।

৮. বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবেন না,কিছুক্ষণ পর পর বসে বা শুয়ে বিশ্রাম নিন।

৯.বাম পাশ ফিরে শোয়ার চেষ্টা করুন। এতে মেরুদণ্ডের ওপর চাপ যেমন কম পরবে, তেমনি দেহে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে না। ঘুমানোর সময় দুই পায়ের মাঝে বালিশ ব্যবহার করতে পারেন, যাতে ওপরের পায়ের ভর বালিশে পড়ে। পেটের নিচেও বালিশ ব্যবহার বা পিঠের দিকে বালিশ দিয়ে সাপোর্ট দিতে পারেন।

১০. রিলাক্সেশনের টেকনিকগুলো এপ্লাই করা যেমন-
– সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করুন
– কোমর সোজা করে বসার চেষ্টা করুন
– কাঁত হয়ে সোয়ার চেষ্টা করা ইত্যাদি

১১. যদি ব্যথা বেশি থাকে তবে বেশি সিঁড়ি বাইবেননা।

১২. গর্ভকালীন কোমর ব্যথা যেহেতু ব্যথানাশক ওষুধ ব্যবহার করা যায় না তাই ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা অনেক উপকারী। এক্ষেত্রে কিছু থেরাপিউটিক ব্যায়াম করতে হবে; যেমন-

-ব্যাক মাসল স্ট্রেন্দেনিং এক্সসারসাইজ
– এ্যাবডোমিনাল এক্সারসাইজ
-কোর মাসল স্ট্রেন্দেনিং এক্সারসাইজ
-পেলভিক ব্রিজিং এক্সারসাইজ ইত্যাদি

(যা গর্ভকালীন সময়ে কোমরের মাংসপেশীর শক্তি বজায় রাখে ও গর্ভকালীন কোমর ব্যথা অনেকাংশে কমায়)

এ ছাড়াও আর কিছু করণীয় হতে পারে-

গর্ভাবস্থায় কোমর ব্যথা দূর করতে উপকারী কিছু সেল্ফ স্ট্রেচিং এবং স্ট্রেন্দিনিং ব্যায়াম করা যেতে পারে। তবে অবশ্যই আপনি একজন ফিজিওথেরাপি ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা করে আপনার জন্য যে ব্যায়ামটি ভালো হবে, সেটি করবেন। যেমন-

★ গর্ভাবস্থায় স্ট্রেচিং ব্যায়াম করলে স্বস্তি মিলতে পারে। তবে এ ধরনের ব্যায়াম যেন দ্রুত করা না হয় বা স্ট্রেচিং বেশি করা না হয়। যখনই মনে হবে অসুবিধা বা ব্যথা হচ্ছে, তখনই ব্যায়াম বন্ধ করুন

★ স্ট্রেন্দিনিং ব্যায়াম করবেন। তবে এ ধরনের ব্যায়াম যেন দ্রুত এবং বেশি করা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ব্যায়ামের সময় ব্যথা বা অন্য কোনো অসুবিধা মনে হলে ব্যায়াম বন্ধ করে দিতে হবে

কারা কোমর ব্যথার ঝুঁকিতে বেশিঃ

১. গর্ভাবস্থার আগেই যাদের কোমর ব্যথা থাকে

২. পূর্ববর্তী গর্ভকালীন সময়ে যদি কোমর ব্যথা হয়ে থাকে

৩. ঋতুকালীন সময়ে যদি কোমর ব্যথা হয়

৪. গর্ভবতী মায়ের বয়সের সঙ্গে সঙ্গে গর্ভকালীন কোমর ব্যথার প্রবণতা বাড়তে থাকে

৫. ধূমপায়ী মায়েদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি

প্রসব-পরবর্তী করণীয়ঃ

এছাড়াও প্রসব-পরবর্তী ফিজিওথেরাপি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বিশেষ করে কোমর ও পেটের শিথিল হয়ে যাওয়া মাংসপেশীগুলো শক্তি বৃদ্ধি করার জন্য কিছু থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ বা ব্যায়াম করতে হবে যেমন-পেলভিক-ফ্লোর এক্সারসাইজ, ব্যাক মাসল স্ট্রেন্দিনিং এক্সারসাইজ; এ্যাবডোমিনাল এক্সারসাইজ ইত্যাদি। ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যায়াম করলে প্রসব পরবর্তী কোমর ব্যথা থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।

ডা. শিফা তুন নিশা
গাইনেকোলজিক্যাল ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ
ইনচার্জ, ফিমেল ইউনিট
অলিভ’স ফিজিওথেরাপি উত্তরা
এপয়েন্টমেন্টঃ ০১৭৩৬৪৪৮৪৮৪

আপনার মতামত দিন :