এলার্জি কি ও কেন হয়? মুক্তির উপায়

নিউজ নিউজ

ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১:০৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩০, ২০২০

ডাঃ ইসমাইল আযহারি :

হাইপারসেনসিটিভিটি :
মনে করুন, সুজন এবং রিফাত দুই বন্ধু, দুইজনই সুস্থ মানুষ। তারা সকাল বেলায় ফজর নামাজ পড়ে একটা ফুল বাগানে গেলো ঘুরতে, ১০ মিনিট পরে রিফাতের কাশি শুরু হলো, সাথে বমিবমি ভাব। তাহলে বুঝতে পারতেছেন, ফুলের ঘ্রাণে একজনের প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক,( Normal reaction) , অন্যজনের প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক, বা Abnormal Reaction.

আবার মনে করুন, Masum আর Badhan দুইজন ক্লোজ বন্ধু, দুইজন একটা রেস্টুরেন্টে খেতে গেলো, দুইজনই সুস্থ গরুর গোস্ত দিয়ে দুইজনই খাবার খেলো, খাবার শেষে বাধন সুস্থ স্বাভাবিক রহিলো, আর মাসুমের শরিরে লাল লাল র‍্যাশ দেখা দিলো, চুলকাতে লাগলো, তাহলে গরুর গোস্ত একজনের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, অন্যজনের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।

তাহলে কোনো একটি #অক্ষতিকর বস্ত যদি কোনো সুস্থ শরীরে অস্বাভাবিক এবং অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া দেখায়, তাকে #হাইপারসেনসিটিভিটি বলে।

Hypersensitivity is undesirable reaction produced by the Normal Immune system.

এলার্জিঃ
এলার্জি হচ্ছে ইমিউন সিস্টেমের একটা দীর্ঘমেয়াদি / স্থায়ী অবস্থা, যা পরিবেশের কোনো এলার্জেনের কারণে শরীরে হাইপারসেনসিটিভিটি দেখায়, কিংবা অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া দেখায়।।

এলার্জেনঃ
যদি কোনো বস্ত কোনো মানুষের শরীরে হাইপারসেনসিটিভ রিয়েক্ট দেখায়, সেইসব বস্ত সেইসব মানুষের জন্য এলার্জেন।

অর্থাৎ যেই বস্ত কোনো মানুষের সংস্পর্শে আসলে সেই মানুষের মধ্যে অস্বাভাবিক অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া দেখায়, সেইসব বস্ত তার জন্য এলার্জেন, যেমন উপরের উদাহরণে রিফাত এবং সুজন দুইজনে বাগানে গেল, বাগানের ফুলের ঘ্রানে কিংবা ফুলের পাপড়ির কারণে সুজনের কোন সমস্যা হয় নাই, তবে রিফাতের বমি বমি ভাব কিংবা কাশি শুরু হয়ে গিয়েছে, তাই ফুলের পাপড়ি, ফুলের ঘ্রাণ সুজনের জন্য স্বাভাবিক হলেও রিফাতের জন্য অ্যালার্জেন,

একই বস্তু একজনের জন্য স্বাভাবিক হলেও অপরের জন্য অ্যালার্জি হতে পারে, যেমন লক্ষ্য করুন মাসুম এবং বাঁধন দুইজন রেস্টুরেন্টে গোশত দিয়ে খাবার খেয়েছে , বাঁধনের কোন সমস্যা হয় নাই কিন্তু মাসুমের শরীরে র‍্যাশ দেখা দিয়েছে এবং চুলকানি শুরু হয়েছে সুতরাং গোশত বাঁধনের জন্য স্বাভাবিক হলেও মাসুমের জন্য ছিল অ্যালার্জেন।

এলার্জিক রিএকশনঃ
কোন অ্যালার্জেন শরীরের সংস্পর্শে এলে শরীরে যেসব অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায় তাকে এলার্জিক রিএকশন বলে, আবার এটাকে হাইপেরসেন্সিতিভিটি রিএকশনও বলা হয়, হাইপারসেনসিটিভিটি রিএকশন কে চার ভাগে ভাগ করা যায়, তবে চার প্রকারের মধ্যে টাইপ-১ হাইপারসেনসিটিভিটি নিয়ে এখানে আলোচনা করবো,
কোন অ্যালার্জেন দ্বারা শরীরের যেসব হাইপারসেনসিটিভিটি রিএকশন দেখা দেয় তাকে টাইপ ওয়ান হাইপারসেনসিটিভিটি রিএকশন বলা হয়।

এলার্জি হিসেবে স্বাভাবিকভাবে আমরা যা বুঝে থাকি তা মূলত টাইফ ওয়ান হাইপারসেনসিটিভিটি রিএকশনকে বোঝায়,

অ্যালার্জেনের উদাহরণ :
সাধারণত ধুলাবালি, কীটপতঙ্গের কামড়, মশা-মাছির সংস্পর্শ, নির্দিষ্ট কিছু খাবার, ঘ্রাণ, ফুলের পাপড়ি, ইত্যাদি ব্যক্তিভেদে এলার্জেন হিসাবে কাজ করে।
ধুলাবালির এলার্জি কে ডাস্ট এলার্জি বলে,
ঘ্রাণের এলার্জি কে স্মেল এলার্জি বলে,
খাবারের এলার্জিকে #ফুড_এলার্জি বলে।

হিস্টামিন :
এলার্জিক রিএকশন এর ফলে শরীরে একধরনের এন্টিবডি তৈরি হয় যাকে ইমিউনোগ্লোবিউলিন ই বলা হয়, শরীরের কানেকটিভ টিস্যু সমূহে প্রচুর পরিমাণ মাস্ট সেল রয়েছে,
এলার্জিক রিএকশন এর ফলে ইমিউনোগ্লোবিউলিন-ই তৈরি হয়ে মাস্ট সেল সমূহকে উত্তেজিত করে, মাস্ট সেল এর অভ্যন্তরে এক প্রকার রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে যাকে হিস্টামিন বলে, এলার্জিক রিএকশন এর ফলে ইমিউনোগ্লোবিউলিন-ই এর ফলে যখন মাস্ট সেল সমূহ ভেঙ্গে যায়, তখন মাস্ট সেল সমূহের অভ্যন্তর থেকে হিস্টামিন নামক এক প্রকার রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত হয়।

হিস্টামিনের কাজ :
টাইপ 1 হাইপারসেনসিটিভিটি রিএকশন এর ফলে যখন মাস্ট সেল ভেঙ্গে হিস্টামিন রিলিজ হয়, তখন হিস্টামিন শরীরের অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট কিছু কাজ করে থাকে,
হিস্টামিন সর্বপ্রথম যে কাজটি করে থাকে তা হচ্ছে ব্লাড ভেসেল সমূহে যে ক্যাপিলারি রয়েছে, এই ক্যাপিলারি পার্মিয়াবিলিটি বাড়িয়ে দেয় যার কারণে রক্ত থেকে জলীয় অংশ রক্তনালীর বাইরে বেরিয়ে আসে।
হিস্টামিন একপ্রকার ইরিট্যান্ট পদার্থ হিসাবে কাজ করে,
যার কারণে চুলকানি, কিংবা প্রদাহ তৈরী হয় এবং র‍্যাশ দেখা দেয়।

কমন এলার্জিক রিএকশন সমূহ :

এলার্জিক রাইনাইটিস :
অনেক সময় দেখা যায় যে বৃষ্টির পানিতে ভিজলে কিংবা পুকুরে গোসল করলে কিংবা কোন ধুলাবালিতে গেলে কিংবা একটু ঠান্ডা লাগলে অথবা কোন ঠান্ডা পানীয় পান করলে কারো কারো সর্দি কাশি শুরু হয়ে যায়, আবার এই সেম কাজগুলো অন্যরা করলে তাদের কিছুই হয় না, তাহলে বুঝা গেল বৃষ্টির পানি কিংবা ধুলাবালি কিংবা পুকুরের পানি কিংবা ঠান্ডা জলীয় বস্তু কারো কারো জন্য অ্যালার্জেন হিসেবে কাজ করে আর কারো কারো জন্য এটা স্বাভাবিক বস্তু হিসেবে থাকে, এই স্বাভাবিক বস্তুগুলো যাদের জন্য অ্যালার্জেন হিসেবে কাজ করে তাদের সর্দি কাশি শুরু হয়ে যায়, যাকে এলার্জিক রাইনাইটিস বলে, এলার্জিক রাইনাইটিস হলে সাধারণত শ্বাসযন্ত্রের মিউকাস মেমব্রেন সমূহ আক্রান্ত হয় এবং হিস্টামিনের প্রভাবে সেখান থেকে প্রচুর পরিমাণ মিউকাস তৈরি হয় এবং শ্বাসযন্ত্রে লুউকোট্রিন নামক এক প্রকার পদার্থ তৈরি হয় যা কাশি তৈরিতে শ্বাসযন্ত্র কে উত্তেজিত করে। তাহলে আমরা বুঝতে পারলাম, নাক দিয়ে পানি পড়া তথা সর্দি কাশি, সাথে হালকা হালকা গায়ে গায়ে জ্বর থাকা এই সবকিছু অ্যালার্জিক রাইনাইটিসের কারণে হয়ে থাকে। অনেক সময় রাইনো ভাইরাস এলার্জি হিসেবে কাজ করে।

এলার্জিক কনজাংটিভাইটিস :
এলার্জিক কনজাংটিভাইটিস মূলত চোখের একটি এলার্জিক জাতীয় রোগ এখানে চোখ লাল হয়ে থাকে চোখ থেকে পানি পড়ে ব্যথা করে, 6 থেকে 12 বছরের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এটা বেশি দেখা দেয় আবার বয়স কত হতে পারে মূলত যাদের শরীর কোন নির্দিষ্ট অ্যালার্জেনের প্রতি অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখায় তাদের অ্যালার্জিক রাইনাইটিসের মত এলার্জিক কনজাংটিভাইটিস হতে পারে।
কিছু কিছু বাচ্চাদের দেখা যায় তারা পুকুরে গোসল করলে কিংবা খেলাধুলা করলে কিংবা বাহিরে চলাফেরা করলে তাদের চোখ লাল হয়ে যায় চোখ থেকে পানি পড়ে এবং ব্যথা করে চোখ চুলকায় এগুলো মূলত এলার্জিক কনজাংটিভাইটিস এর কারণে হয়ে থাকে।

ফুড অ্যালার্জি :
অনেক মানুষ আবার এমন রয়েছে যে তারা গোশত কিংবা বেগুন কিংবা বাহিরে রেস্টুরেন্টে খাবার খাওয়ার পরে তাদের শরীরে চুলকানি শুরু হয়ে যায়, বমি বমি ভাব হয় ,এগুলো মূলত এলার্জির কারণে হয়ে থাকে , তাদের শরীর ওই সমস্ত খাবারের জন্য উপযোগী না ,এবং ঐ সমস্ত খাবার গুলো যদিও অন্যদের জন্য স্বাভাবিক, তবে তাদের জন্য অ্যালার্জেন হিসেবে কাজ করে ,তাই তারা যখন ওই খাবারগুলো খায় যেমন গোশত খাবার পরে তার সারা শরীর চুলকাতে চুলকাতে লাল হয়ে গেছে তাহলে গোশত তার জন্য অ্যালার্জেন।

ড্রাগ এলার্জি :
কিছু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, তারা কোন এন্টিবায়োটিক খাবার পরে তাদের শরীর চুলকাতে চুলকাতে লাল হয়ে যায় ,তাহলে বুঝে নিতে হবে ওই এন্টিবায়োটিকের প্রতি তার হাইপারসেনসিটিভিটি রয়েছে এবং ওই এন্টিবায়োটিক তার জন্য অ্যালার্জেন হিসেবে কাজ করতেছে, যদি কারো এমন হয়ে থাকে তাহলে সে ওই এন্টিবায়োটিক পরিবর্তন করে অন্য এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করবে। কোন মেডিসিন ব্যবহারের ফলে যদি কোন হাইপেরসেন্সিতিভিটি রিএকশনস শুরু হয় তবে সেই প্রকার এলার্জিকে ড্রাগ এলার্জি বলা হয়ে থাকে।

এনাফাইলেক্টিক রিএকশনঃ
এনাফাইলেকটিক রিএকশন হচ্ছে এক প্রকার ইমারজেন্সি এলার্জিক কন্ডিশন, মনে করুন কারো শরীরে একটি কীটপতঙ্গের সংস্পর্শ লেগেছে , অথবা কোন ছোট মশা কিংবা অন্যান্য কীটপতঙ্গ তাকে কামড় দিয়েছে, এর কিছুক্ষণ পরে দেখা গেল তার শরীররে লাল লাল চাকা হয়ে গেছে শরীর প্রচন্ড চুলকাইতেছে সারা শরীর ব্যথা করতেছে এই অবস্থা গুলোকে এনাফ এলেক্ট্রিক রিঅ্যাকশন বলে, যাদের শরীর হাইপারসেনসিটিভ, তাদের ক্ষেত্রে মশার কামড়ে কিংবা ছারপোকার কামড়ে ও এনাফাইলেকটিক রিঅ্যাকশন দেখা দিতে পারে।

এটপিক একজিমাঃ একপ্রকার এলার্জিক স্কিন কন্ডিশন,
যা এলার্জিক রিয়েকশন এর কারণে হয়ে থাকে।

চিকিৎসা :
প্রথমে জেনে রাখা ভালো,
এলার্জির স্থায়ী কোনো চিকিৎসা নাই, কারণ এইটার সম্পর্ক ইমিউনো সিস্টেমের সাথে, তাই যাদের যেইসব বস্ততে এলার্জি রয়েছে, তা পরিহার করে চলাই হচ্ছে মূল চিকিৎসা।

আর অনিয়ন্ত্রিত চলাফেরার কারণে যাদের এলার্জিক উপসর্গ সমূহ দেখা দেয়, তারা মেডিসিন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ রাখবে।।

মেডিকেশনঃ
এলার্জি যেহেতু হিস্টামিনের খেলা, তাই এলার্জি নিয়ন্ত্রণ রাখতে হলে হিস্টামিন নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে, সেই জন্য
এলার্জিক কন্ডিশনে #এন্টি_হিস্টামিন হচ্ছে এলার্জির মেডিসিন।

এন্টি হিস্টামিন আবার দুই প্রকার
sedative : যেইসব এন্টিহিস্টামিনের ব্যবহারে ঘুম হয়, তাকে সেডাটিভ বলে, আবার এই গুলিকে First Generation antihistamin

Cholpheniramine: (histal 4 mg)
hydroxtzine HCL (xyril 10 mg)

Non-Sedative :
যেইসব এন্টিহিস্টামিনের সেডাটিভ ইফেক্ট তুলনামূলক কম, তাকে নন-সেডাটিভ এন্টি হিস্টামিন বলে।
এইগুলিকে 2nd Generation Antihistamine ও বলা হয়।
উদাহরণ : Desloratadine (Deslor 5 mg)
. Fexophenadine (Fexo 120)
Rupatadine ইত্যাদি।

এনাফাইলেক্টিক রিএকশন এর ক্ষেত্রে হাইড্রোকর্টিসোন আইভি দেওয়া হয়ে থাকে।

লিখেছেন,
ডাঃ ইসমাইল আযহারি
এমবিবিএস, ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ

আপনার মতামত দিন :