অতিরিক্ত বেতন আদায়ের অভিযোগ বেসরকারি মেডিকেল শিক্ষার্থীদের

নিউজ নিউজ

ডেস্ক

প্রকাশিত: ৫:০০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৯, ২০২০

দেশের কয়েকটি বেরসকারি মেডিকেল কলেজে সাপ্লিমেন্টারি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত বেতনের চেয়ে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীরা জানান, পুরো এমবিবিএস কোর্সের জন্য ৬০ মাসের বেতন নির্ধারণ করা আছে। তবে কিছু মেডিকেলে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের কেউ কোনো বিষয়ে অকৃতকার্য হলে সরকারি বিধি উপেক্ষা করে তার কাছে থেকে অতিরিক্ত ছয় মাসের বেতন আদায় করা হয়।

তারা জানান, ত্রিশের অধিক মেডিকেলে অতিরিক্ত বেতন নেওয়া হলেও বাকি মেডিকেলগুলোতে সরকার নির্ধারিত টাকাই নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে জড়িত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারির পরিপ্রেক্ষিতে কোনো কোনো কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সরকারের নির্দেশনা মানতে বাধ্য সব মেডিকেল কলেজ।

যা বললেন শিক্ষার্থীরা

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কিশোরগঞ্জ জেলার একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের একজন সাপ্লিমেন্টারি শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের সিনিয়র ভাইদের কাছ থেকে ইতিপূর্বে অতিরিক্ত ছয় মাসের বেতন নেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আমাদের কাছেও দ্রুতই অতিরিক্ত বেতনের নোটিস চলে আসবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী কলেজ কর্তৃপক্ষের ৬০ মাসের বেতন নেওয়ার কথা। এর অতিরিক্ত বেতন নেওয়া বেআইনি, অনৈতিক। এছাড়া এ বছর করোনার কারণে আমাদের অভিভাবকদের আর্থিক অবস্থা খুবই নাজুক। এ অবস্থায় বর্ধিত বেতন দেওয়াটা আমাদের জন্য বিশাল এক চাপ।’

চট্টগ্রামের বিজিসি ট্রাস্ট মেডিকেল কলেজের এক শিক্ষার্থী  বলেন, ‘আমাদের মেডিকেলে একজন শিক্ষার্থী যতদিন ফাইনাল প্রফে বসতে না পারে ততদিন বেতন দিতে হয়। এই কারণে আমাদের মেডিকেলে ফাইনাল প্রফে এসেসমেন্টে বেশির ভাগকে আটকিয়ে দেওয়া হয়। ৭-৮ বছর বা যতদিনে ফাইনাল প্রফে বসতে না পারে ততদিন পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রীদের বেতন দিতে হয়। আবার ফাইনাল প্রফে বসতে পারলেও যতদিন ফাইনাল প্রফে পাস করতে পারবে না ততদিন পর্যন্ত বাৎসরিক ফি দিতে হয়। এই কারণে আমাদের মেডিকেলে ফাইনাল প্রফে পাসও করে কম।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রংপুর বিভাগের একটি মেডিকেল কলেজের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমি দ্বিতীয়বার সাপ্লিমেন্ট পরীক্ষা দিচ্ছি। একবার ছয় মাসের অতিরিক্ত বেতন দিয়েছি। এখন আবারও বেতন দিতে হবে। এ অনিয়মের বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ কথা বলছে না, এ শঙ্কায় যে এতে যদি আবারও অকৃতকার্য দেখানো হয়।’

ওই সাপ্লিমেন্টারি শিক্ষার্থী আরও বলেন, ‘আমি প্রিন্সিপ্যাল স্যারের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনায় সময় বলেছি, আমাদের পাশের অন্য মেডিকেলে অতিরিক্ত বেতন নেওয়া হচ্ছে না। জবাবে তিনি বলেছেন, কে কি করলো তা দেখার বিষয় না। আমাদের মেডিকেলে আমাদের নিয়ম চলে, কে কোন নিয়মে চলছে তা আমাদের দেখার বিষয় না। যতদিন ছাত্র থাকবে সাপ্লি খেলে তোমাদেরকে ছয় মাসের বেতন দিতে হবে। এটাই এখানকার নিয়ম।’

ওই শিক্ষার্থী আরও বলেন, ‘৪২টিরও বেশি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ছয় মাসের বেতন মওকুফ করে দিয়েছে। এসব বন্ধ হয়েছে আন্দোলনের মুখে। আমার কথা হলো, আন্দোলন করে কেন বন্ধ করতে হবে—যেখানে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ আছে ষাট মাসের বেশি বেতন নেওয়া যাবে না?’

কলেজ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

এ প্রসঙ্গে রংপুরের প্রাইম মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. মো. নূর ইসলাম  বলেন, ‘ছাত্রত্ব যতদিন বেতনও ততদিনই হয়, এটাই নিয়ম। সরকার পাঁচ বছরের একটি বেতন নির্ধারণ করে দেয়। এমন ছাত্রও আছে যে দ্বিতীয় বর্ষেই উত্তীর্ণ হতে পারে না। তৃতীয় বর্ষেও পাস করতে পারে না। তার বন্ধুরা কিন্তু পাঁচ বছরে ডাক্তার হয়ে গেছে। যারা ডাক্তার হয়ে গেছে তাদের তো অতিরিক্ত বেতন গুণতে হচ্ছে না। কিন্তু যে ছাত্র তৃতীয় বর্ষে পাস করতে পারলো না। ব্যক্তিগত-পারিবারিক যে কোনো কারণে অকৃতকার্য হওয়ায় দ্বিতীয় বর্ষ বা তৃতীয় বর্ষে থেকে গেলো। তাকে তো চালিয়ে নিতে হবে, নাকি বাদ দেবে? এখন সরকার যদি এভাবে নির্দেশনা দেয় তাহলে সেভাবেই হবে। সব মেডিকেল কলেজ তা মানতে বাধ্য। এটা বাস্তবায়নে অসুবিধার কিছু নাই।’

সরকারের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী প্রায় ৪২টি মেডিকেল কলেজ সাপ্টিমেন্টারি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত বেতন নিচ্ছে না। এ অবস্থায় আপনার মেডিকেলসহ কয়েকটি মেডিকেলে অতিরিক্ত বেতন নেওয়ার বিষয়টি কিভাবে দেখেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সরকার যদি নির্দেশ দেয়, তাহলে আমরা অতিরিক্ত বেতন নেবো না। কিন্তু বিষয়টি আমার কাছে পরিষ্কার না। এখন আইন তো সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।’

ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের

বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তি ফি, ইন্টার্নি ভাতা ও টিউশন ফি নির্ধারণ করে দেওয়া আছে জানিয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. এ এইচ এম এনায়েত হোসেন  বলেন, ‘কেউ অতিরিক্ত বেতন নিচ্ছে কি নিচ্ছে না এ ব্যাপারে আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি। আমাদের আইনে সুস্পষ্ট লেখা আছে, মেডিকেল কলেজগুলো কত টাকা নিতে পারবে। ২০১৭-১৮ সালে যে চিঠি দেওয়া হয়েছে সেখানে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে লেখা আছে একজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে কত টাকা নিতে পারবে।’

তিনি আরও বলেন, কেউ যদি এর বেশি নেয় তাহলে তা বেআইনি হবে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীকে তার অধিকার জানতে হবে। তাকে প্রতিবাদ করতে হবে যে অতিরিক্ত টাকা কেন নিচ্ছেন—এ ব্যাপারে তো আইন আছে। মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে।

আইন ভঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আপনারা ব্যবস্থা নেবেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অভিযোগ আসতে হবে। প্রমাণসহ অভিযোগ না আসলে আমরা কিভাবে ব্যবস্থা নেবো? কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান নিচ্ছে, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান নিচ্ছে না—এভাবে ঢালাওভাবে বলা হলে তো ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। আমরা মিটিংয়ে সব সময় বলেছি, অতিরিক্ত ফি-বেতন নেওয়া যাবে না, যা আইনে পরিষ্কার করা আছে। যে দিচ্ছে তার উচিত মন্ত্রণালয়ের কাগজ প্রতিষ্ঠানের নজরে আনা। সে দিচ্ছে কেন, সে কেন অন্যের কাছে মাথা নত করবে? কোনো প্রতিষ্ঠান এ রকম করলে শিক্ষার্থীদের উচিত আমাদের জানানো। অস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা অ্যাকশনে যেতে পারি না।’

শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত বেতনের প্রমাণ দিলে আপনারা সংশ্লিষ্ট মেডিকেল কলেজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তারা বর্ধিত বেতনের রশিদ দেখাক, এমনিতে অভিযোগ করলেই হবে না, প্রমাণ থাকতে হবে। প্রমাণ থাকলে আমরা প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করবো, তদন্ত করবো। কেউ অনিয়মের শিকার হলে প্রমাণ দিক, ব্যবস্থা নেবো। দালিলিক প্রমাণ ছাড়া ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।’

অতিরিক্ত বেতন আদায় মেডিকেল কলেজ আইনের পরিপন্থি

সরকার নির্ধারিত বেতনের চেয়ে অতিরিক্ত বেতন আদায়কে বিদ্যমান আইনের পরিপন্থি বলে জানিয়েছেন পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা। বর্ধিত বেতনের জন্য চাপ সৃষ্টি করাকে অনৈতিক আখ্যা দিয়ে তারা বলেন, বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশনের (বিডিএফ) প্রধান সমন্বয়ক ডা. নিরুপম দাশ  বলেন, বিষয়টি নিয়ে আসলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের বসা উচিত। নিয়মটা হলো—ষাট মাসের বেতন নিতে পারবে, এর বেশি না। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, কেউ পরীক্ষায় ফেল করলে, অথবা কোনো কারণে পরীক্ষায় অ্যাটেন্ড করতে না পারলে যতদিন না ফাইনাল প্রফ হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত তার বেতন দিতে হচ্ছে। এটি মেডিকেল কলেজ আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থি।

তিনি আরও বলেন, যেসব মেডিকেল কলেজ অতিরিক্ত বেতন আদায় করছে তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা দরকার। তারা যাচ্ছে তাই করতে পারেন না, এটা মগের মুল্লুক না।

কর্তৃপক্ষের যথাযথ নজরদারির অভাবে কিছু কিছু মেডিকেল কলেজ এমন কাজ করতে পারছে বলেও মনে করেন ডা. নিরুপম দাশ।

জানতে চাইলে ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি, রাইটস অ্যান্ড রেসপনসিবিলিটিস (এফডিএসআর) মহাসচিব ডা. শেখ আব্দুল্লাহ আল মামুন  বলেন, ‘এটা অন্যায়। এ ধরনের অনিয়ম থাকা উচিত না। আইন মেনে বেশিরভাগ মেডিকেল কলেজ যা করছে অন্যদেরও তা করা উচিত। অতিরিক্ত বেতন আদায়ের সিদ্ধান্ত থেকে তাদের সরে আসা উচিত। বর্ধিত বেতনের জন্য চাপ সৃষ্টি করা অনৈতিক।’

তিনি আরও বলেন, এই অনিয়ম দেখা যাদের দায়িত্ব তাদের উচিত বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা, এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।

আপনার মতামত দিন :